Sunday, March 12, 2017

সেই সব মেয়েরা



মাধবীলতা  (কালবেলা/ সমরেশ মজুমদার) – বিপ্লবের আর এক নাম| অনিমেষ যখন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, অত্যাচারে পঙ্গু হয়ে জেলে কোমর ঘষটে বেড়াচ্ছে, মাধবীলতা তখন তার আর অনিমেষের সন্তানকে জন্ম দিচ্ছে, বড় করছে| একজন অবিবাহিত মেয়ের পক্ষে এটা আজও সহজ নয়, সত্তরের দশকে তো প্রায় অসম্ভব| বিপ্লব মানে যে শুধু বন্দুক পিস্তল লাল সেলাম নয়, বরং সমাজটাকে ঘাড়ে ধরে অন্যভাবে ভাবতে বাধ্য করা, আর ভাবাটা যে নিজের জীবন থেকেই শুরু করতে হয়, এটা এর চেয়ে ভালো করে বলা যায় না| লড়াকু|

কিরণময়ী (চরিত্রহীন/ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়) – সন্তানধারণের জন্য যা দরকার তা-ই নারীর রূপ, এই ভয়ানক সত্যি কথাটা প্রায়ান্ধকার রান্নাঘরে লুচি বানাতে বানাতে যিনি অবলীলায় নিজের পছন্দের বিবাহিত পুরুষকে বলে ফেলতে পারেন, তাঁর ধক আছে, মানতেই হবে| সেই পুরুষ তাঁকে যথেষ্ট পাত্তা না দিলে তার যুবক ভাইকে বিছানায় আত্মসমর্পণ করতে একরকম বাধ্য করে যিনি প্রতিশোধ নেন, তাঁর সাহস নিয়েও প্রশ্ন তোলা সাজে না| উপন্যাসের শেষে কিরণের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট না করে লেখকের উপায় ছিল না| উন্মাদ রূপসীর প্রতি সমাজের সহানুভূতি থাকে, স্বাধীনচেতা বিধবার জন্যে সে নির্মম, অন্ততঃ সেই সময়ে|

‘চোখের বালি’র বিনোদিনীকেও এই লিস্টে রাখা যেত, যদি সে মহেন্দ্র কাছে এলে আরেকটু সাহস দেখাতে পারত| তবে বিনোদ আর কিরণ দুজনের ক্ষেত্রেই একটা ব্যাপার কমন| দুজনেই রীতিমত লেখাপড়া শিখেছে, ফলে দুজনেই সমাজকে, সিস্টেমকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছে( যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে ইত্যাদি ...)| মাচ এহেড অফ হার টাইমস|

প্রমীলা পাল (অদ্বিতীয়/ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়) – শরদিন্দুর লেখায় মহিলা চরিত্ররা খুব একটা গ্লোরিফায়েড হন না, বলাই বাহুল্য| রট্টা যশোধরা, বীরশ্রী যৌবনশ্রী ইতিউতি আছেন বটে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা পুরুষের প্রেমিকা, স্ত্রী বা সহকারী হিসেবে বর্তমান, ইংরেজিতে যাকে বলে playing second fiddle.  মেয়েরা পুরুষকে সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছেন, এমনটা প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে| প্রমীলা চোখে পড়ার মত ব্যতিক্রম| দিনে শান্তা, রাতে তপন সেজে সে কাজ হাসিল করত| নেহাত বোকার মতন চিন্তামণিবাবুর দূরবীনের পাল্লার মধ্যে খুনটা না করলে তার টিকিটিও পুলিশ গোয়েন্দা কেউ ছুঁতে পারত না, গ্যারান্টি|ইন্টারেস্টিং|

সত্যবতীর কথাও লেখাই যেত| আফটার অল, গোয়েন্দাকে কাবু করে তাঁর ঘরণী হয়ে বসা, এবং তাকে নরমে-গরমে রাখা, প্লাস বরের আইবুড়ো বন্ধুকে সারাজীবন দেখভাল করা ( সে যতই অজিত বলুক ‘সত্যবতীকে পাইয়াছি একাধারে ভগিনী ও ভ্রাতৃবধূরূপে’) মুখের কথা নয়| কিন্তু যখন মনে পড়ে ব্যোমকেশের সত্যকে ভালো লাগার কারণ করালীবাবু মারা গেছেন জেনেও দাদাকে বাঁচানোর জন্যেই চুপচাপ থাকা (‘অন্য মেয়ে হলে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করত – আর আপনি’ ইত্যাদি)তখন আর লিখতে ইচ্ছে করল না|

মিস বিপুলা মল্লিক (চিকিত্সা সংকট/ পরশুরাম) – সাতসকালে যদি কোনো আধদামড়া ভদ্রলোক একজন মহিলা ডাক্তারের চেম্বারে এসে বলেন তিনি অসুস্থ, এযাবত হেকিম, বৈদ্য, কবিরাজ দেখিয়েও সে রোগের সুরাহা হয়নি, এবং সেই মহিলা তাঁকে পত্রপাঠ খেদিয়ে না দিয়ে রোগের নিদান বাতলান, তাঁর জন্যে হাততালি পড়তে বাধ্য| বুদ্ধিমতী|

(এই গল্পটা নিয়ে বহুযুগ আগে বাংলা দূরদর্শনে সিরিয়াল হয়েছিল| নন্দ বিপুলার কাছে এসেছেন, এই পর্যন্ত দেখিয়ে একটা এপিসোড শেষ হয়েছিল| আমি তখনো গল্পটা পড়িনি, তাই ভ্যাবলার মতন বাবাকে জিগ্যেস করেছিলাম, আচ্ছা এই ডাক্তার কী ওষুধ দেবে? বাবা মিষ্টি হেসে বলেছিলেন – একেবারে মোক্ষম দাওয়াই!)

আনন্দীবাই (আনন্দীবাই/ পরশুরাম) – স্বামীর আরও দুটো বিয়ে আছে, এটা জানার পরে যিনি স্বামীকে ‘ ডেরেন কা ছুচুন্দর’ নামে আপ্যায়িত করে পিঠে সপাসপ ঝাঁটা চালাতে পারেন, তাঁকে আমার দিব্যি পছন্দ হয়| আর টুনিদিদি (কচি সংসদ)তো আছেনই| যিনি ‘মাছ কোটা হইতে গাড়ি রিজার্ভ করা অবধি’ সব কাজে পারদর্শী, আর এক রাতের মধ্যে ‘এক-শ তেষট্টিটা লাগেজ’ বাঁধাছাঁদা করে বাড়িসুদ্ধ সকলকে বগলদাবা করে দার্জিলিং থেকে কলকাতা পাড়ি দিতে পারেন, তিনি মহীয়সী নন তো কি?

ঝুমুর (শোধ/ তসলিমা নাসরিন) – বিয়ের দেড় মাসের মাথায় সন্তান আসা নাকি অসম্ভব, তাই পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স করে গৃহবধূ হওয়া ঝুমুরকে গর্ভপাতে বাধ্য করাবে ভালোবেসে-বিয়ে-করা স্বামী? বেশ|যখন স্বামীর মনে হয় তাদের এবার একটা বাচ্চা দরকার, তখন নিজের ইচ্ছেমত স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হবে? বেশ| ঝুমুরও তবে নীচের তলার বউ সেবতির দেওর আফজালের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াবে, নিজের সবচেয়ে ঊর্বর দিনগুলোয় স্বামীকে ঘেঁসতে দেবে না কাছে| সন্তানের মুখ দেখে হারুন যত খুশিই হোক, ঝুমুর মনে মনে প্রতিশোধ নেওয়ার আনন্দে হা হা হাসবে| এ তার স্বপ্নের ভ্রূণ নয়, তার ‘ক্ষোভের, যন্ত্রণার ভ্রূণ’| অনবদ্য|

শ্রীময়ী (শনি-রবি/ নবনীতা দেবসেন) – এমনিতেই নবনীতার লেখায় মহিলারা শক্তপোক্ত, স্বনির্ভর, প্রত্যয়ী| শ্রীময়ী নিতান্ত অল্প বয়েসেই মারাত্মক নার্ভের অসুখে হুইলচেয়ারে বন্দী| তাতে কি? সে মেয়ে ‘সাজুনি, ফ্যাশানি’, পড়াশোনায় রীতিমত ভালো, গীটার বাজিয়ে গান গায়| একমাত্র সিদ্ধার্থ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে সে একটু বেকায়দায় পড়ে বটে, কিন্তু মূলতঃ তার চেষ্টাতেই বাড়ির বহুদিনের হারিয়ে-যাওয়া ছেলেটির খোঁজ পাওয়া যায়| এরকম চমত্কার একটা গল্প নিয়ে কেউ সিনেমা বানাচ্ছেন না কেন কে জানে| ইন্সপায়ারিং|

অমৃতা (অমৃতা/ বাণী বসু) – চেনা প্যাটার্ণ| নেহাত অল্প বয়সেই তথাকথিত ‘ভালো পাত্রে’ মেয়েকে সমর্পণ করে বাবামা দায় সেরেছেন| সেই লোকটির শরীরের, অভ্যাসের খোঁজ পেয়েছে অমৃতা, মনের নাগাল পায়নি| তার সন্তানসম্ভাবনা হওয়ার পর স্বামী আর শ্বশুরবাড়ির লোকজন ভ্রূণটিকে নিকেশ করতে চেয়েছে, সহৃদয় ডাক্তারের হস্তক্ষেপে সেটা এড়ানো যায়| এক বন্ধুর মায়ের কাছে আশ্রয় পায় অমৃতা আর তৈরী হতে থাকে পরীক্ষার জন্যে| নিজের পায়ে তাকে দাঁড়াতেই হবে| চমত্কার|

মুম (মুম/ বাণী বসু) – বড়ি হাভেলিতে মেয়ে নেই| মেয়ে জন্মালেই তাকে দুধের কটোরায় চুবিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে যে! বাড়িতে থাকেন বড়ি মালিক আর তাঁর পঞ্চাশোর্দ্ধ্ব ছেলে| এ বাড়িতে থাকতে আসে একটি বাচ্চা, কোথা থেকে কেউ জানে না, নাম বলে মুম| সে আসার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িতে ছোটি মালিকের স্ত্রীর আত্মার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়| জীবিত অবস্থায় যাঁর গলার আওয়াজ পাওয়া যেত না, তিনি ভূত হয়ে সবাইকে বকছেন, রাঁধুনিকে চুরি করতে দিচ্ছেন না, চাকরকে মালিকের স্নানের ঘরে বাথটবে গা এলাতে দেখে তার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করছেন| যে বড়ি মালিকের হুকুমে তাঁর সদ্যোজাত মেয়েকে তিনি মেরে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন, তার উপর মারাত্মক প্রতিশোধ নিচ্ছে মুম| হাড়-হিম-করা|

চন্দরা(শাস্তি/ রবীন্দ্রনাথ) – যে স্বামী দাদাকে বাঁচাতে গিয়ে আমাকে পুলিশের হাতে ঠেলে দিল, বউ গেলে বউ পাওয়া যায় কিন্তু ভাই গেলে ভাই পাবে না এই ভয়ে, ফাঁসির আগে আমি নাকি তার মুখ দেখব? মরণ !

পদিপিসি (পদিপিসির বর্মিবাক্স/ লীলা মজুমদার) – মজবুত মহিলা| মুগুর ভাঁজেন, আর গয়নার বাক্স কোথায় লুকিয়েছেন ভুলে গিয়ে কয়েক জেনারেশন ধরে সব্বাইকে ঘোল খাওয়ান| নমস্য|

এলিস (এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড/ লিউইস ক্যারল) – চারপাশে ক্রমাগত অদ্ভুতুড়ে ঘটনা ঘটতে থাকলেও, আর একের পর এক উদ্ভট পরিস্থিতিতে পড়েও যে ছোট্ট মেয়ে মাথা ঠান্ডা করে থাকে, তাকে ভালো না বেসে উপায় আছে? মিষ্টি|

মাসি (বড়মামা সিরিজ/ সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়) – বিয়ে করেননি| একসেন্ট্রিক ডাক্তার বড়দা, তাঁর প্রায়-পাগলামোর পর্যায়ে চলে যাওয়া পশুপ্রেম, বাস্তববোধহীন প্রফেসর ছোড়দা এবং তাঁর হাজার বায়নাক্কা, এবং বোঝার-ওপর-শাকের-আঁটি বোনপো – এই নিয়েই সংসার| খুরে নমস্কার|

Monday, March 6, 2017

চক্রবত

(ফেসবুক হইতে পুনঃপোষ্টিত - পুরনো লেখা)

- কিরে, ঘরে ভূতের মত বসে আছিস, জেঠিমা কই?
- মা নীচের ঘরে| শুয়েছে বোধ হয়| বোসো|
- না, আমি যাই বুঝলি| কিসব কেনাকাটি করতে বেরোতে হবে বিকেলে, মা বলছিল|   শক্তির বইটা দিয়ে যাচ্ছি| 
- রুমুদি, তুমি চলে যাবে?
- আবার! আমার গীতবিতান ফেরত দিবি বলে দিলাম|
- সত্যি চলে যাবে, রুমুদি?
- যা গিয়ে অনির সঙ্গে ঝগড়া কর গে| কেন নিয়ে যাচ্ছে আমায়| খ্যাপা কোথাকার!
- রুমুদি প্লিজ! আমি মরে যাব| 
- পাগলামি করিস না পাবলো| ছাড়|
- রুমুদি –
- পাবলো! আমার লাগছে|
- রুমুদি, প্লিজ চলে যেও না| আমায় ছেড়ে যেও না, রুমুদি|
রুমির বুকের খাঁজে হালকা চন্দনের গন্ধ| পাবলো পাগলের মত মুখ ঘষতে লাগল|
********************************************************************************
‘রুমুদি, আমায় ছেড়ে যেও না, প্লিজ’ – প্রবাল পাগলের মত মুখ ঘষছিল| দরজায় দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে ছিলেন ডক্টর অনিরুদ্ধ চৌধুরী| রোজই থাকেন| রম্যানি নেই আজ প্রায় ছ-সাত বছর হতে চলল| মনে করলেই বুকের ভেতরটা চিনচিন করে| এখনও| সেই শীতের সন্ধ্যেয়, রুমি যখন পাগলের মত ছুটে এসেছিল তাঁর কাছে, তখন কি করা উচিত ছিল তাঁর? একটু সহানুভূতি, একটু বিশ্বাস, আর অনেকটা ভালোবাসা দিয়ে ঢেকে দেওয়া যেত না, সব? সেদিন যদি তিনি অতটা অবুঝ না হতেন - 

চোয়াল শক্ত হয়ে গেল ডক্টর চৌধুরীর| রম্যানির তালগোল পাকানো দেহটা চোখের সামনে ভেসে উঠল, আবার| প্রায়শ্চিত্ত তাঁকে করতেই হবে| প্রবাল যতদিন বাঁচবে, ততদিন ও এখানেই থাকবে| এই ওয়ার্ডেই| থাকতেই হবে ওকে, তাঁর চোখের সামনে, ওই গোবদা টেডিবেয়ারটা জাপটে ধরে| 

ফাদার্স ডে

(ফেসবুক হইতে পুনঃপোষ্টিত - পুরনো লেখা)

যখন স্কুলে পড়তাম, তখন প্রথম শুনলাম ভ্যালেন্টাইন ডে-র কথা, যদিও তখন ভালবাসার মানে আর্চিজ গ্যালারী হয়ে ওঠেনি, কলকাতার কাপলরা সাউথ সিটির বদলে ঢাকুরিয়া লেকে প্রেম করত, প্রথম কথা বলার দিনে পাড়ার দোকান থেকে দু-টাকার কার্ড কিনে নিয়ে যেত| তার পর এল ফ্রেন্ডশিপ ডে| স্কুলশুদ্ধু সক্কলে দেখি এ ওকে ফ্রেন্ডসলেখা একখানা তাগা পরাচ্ছে| কি আপদ রে বাবা! 

ইদানিং তো হাগ ডে, রোজ ডে, কিস ডে কিছুই বাদ যায় না|তবে সবচেয়েবড় গব্বযন্ত্রণা বোধ হয় ঘটা করে মাদার্স ডে আর ফাদার্স ডে পালন| যাঁরা না থাকলে আমরা জাস্ট নেই হয়ে যেতাম, যাঁরা আমাদের জন্যে এত করেন যে হাজার বছর অষ্টপ্রহর থ্যাঙ্ক ইউ বললেও যথেষ্ট হবে না, তাঁদের নিয়ে মাত্র একদিন মাতামাতি করার, তাঁদের কে কতটা ভালবাসে সর্বসমক্ষে ঘোষণা করার মধ্যে একটা অশালীন আদেখলেপনা আছে|এ অনেকটা মাসের পর মাস রেওয়াজের ধার না মাড়িয়ে হঠাত একদিন তানপুরোর কান মুচড়িয়ে আর্তনাদ বের করা|


তাই এটা ফাদার্স ডে-র গল্প নয়| 


বাবা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচন্ড কড়া অথচ অসম্ভব ছাত্রদরদী অধ্যাপক, কিছুটা একগুঁয়ে, নিজের বিশ্বাসে ইঁটের মত শক্ত এবং ঠিক সেই কারনেই সাংসারিক ব্যাপারে বেশ খানিকটা অনুপযুক্ত| কিন্তু এগুলো যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন তাঁরাই জানেন| এটা সে গল্প নয়| আমার অনুপস্থিতিতে আমার প্রিয় পাড়ার কুকুরকে বাবা নিয়ম করে খাওয়ান, দরকারী কাগজ বাবার কাছে জমা রেখে দুজনেই ভুলে মেরে দিই, বাবার নেলকাটার, শ্যাম্পু, তোয়ালে আমি মাঝে মাঝেই বগলদাবা করি আর সময়ে ফেরত দিই না, এটা সে গল্পও নয়| এটা বাবা আর মেয়ের গল্প| যেমন গল্প সব বাবা আর মেয়ের থাকে|

আমার বাবা ভূতত্ত্ববিদ| সোজা বাংলায়, জিওলজিস্ট| জিওলজির ছাত্রছাত্রীরা জানেন, এই বিদ্যে কেবল ক্লাসরুমে শেখা যায় না, পড়াশোনার অঙ্গ হিসেবে মাঠে ঘাটে পাহাড়ে ঘুরে সেসব জায়গার বৈশিষ্ট্য পরখ করে দেখতে হয়, এক বা একাধিক শিক্ষক সঙ্গে থাকেন| এর পোশাকি নাম ফিল্ড ট্রিপ, চলতিতে ফিল্ডে যাওয়া| বাবাও বিভিন্ন সময়ে সদলবলে ফিল্ড ট্রিপ-এ গেছেন| যতদিন অবোধ ছিলাম ততদিন একরকম ছিল, গোলটা বাধল জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হওয়ার পর| 


আমার বয়েস তখন বছর পাঁচেকের আশেপাশে| বাবা তাঁর দলবল নিয়ে গিয়েছিলেন যে জায়গায়, তার নাম যদ্দুর মনে পড়ে, রামগড়| তখন পোস্টকার্ড আর ইনল্যান্ডের যুগ| কয়েকদিন পর পর বাড়িতে ইনল্যান্ড আসত, ওপরে গোটা গোটা করে আমার নাম, ভিতরে ছাপার হরফের মতন হাতের লেখায় কাজের সূত্রে কোথায় ঘুরলেন, কি দেখলেন তার বর্ণনা| সেখানে হিতোপদেশ নেই, কেবল অনাবিল বন্ধুত্বের সংলাপ| কারো কাছ থেকে গোটা একখানা চিঠি পাওয়া সেই আমার জীবনে প্রথম|


কিন্তু চিঠি পেলে হবে কি, তাতে কি মানুষটার অভাব মেটে? মা-র কাছে শুনেছি, বাবার আদুরে কন্যা সেই সময়টায় সারারাত ভালো করে ঘুমোত না, এপাশ-ওপাশ করে কাটাত| যেদিন বাবা ফিরলেন, সেদিন সে প্রায় নাক ডেকে ঘুমিয়েছিল (মায়ের কথায়, ‘সারারাত যাত্রা দেখে পরেরদিন লোক যেমন ঘুমোয়’)| সেটা জানার পর বাবা আর কোনোদিন ফিল্ডে যাননি| ফিল্ড ট্রিপের নানা মজার ঘটনা বহুবার বলতে শুনেছি, কিন্তু একটিবারের জন্যও আক্ষেপ করেননি আর যাওয়া হয়নি বলে|


এই পরিণত (?) বয়সে এসে বুঝি, কাজের জায়গাতেও নিশ্চয় অসুবিধে হয়েছিল, সমালোচনা হয়েছিল এমন অবস্থানের ফলে| কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টান নি, শুধু নিজের শিশু মেয়েকে নিশ্চিন্ত, নির্ভার, নিটোল রাতের ঘুম উপহার দেবেন বলে|

চরণধ্বনি শুনি....

(ফেসবুক হইতে পুনঃপোষ্টিত)

তাঁর গান সফল অনুবাদ করার চেষ্টা ধৃষ্টতাও নয়, স্রেফ ধ্যাষ্টামো । সে দাবি করাও উচিত নয় । তবে কিনা আমরা তাঁর গানগুলোকে বাপের সম্পত্তি বলে মনে করি, আর বাপের সম্পত্তি মনে করি বলেই, কিঞ্চিত কষ্ট করে বাঁচিয়ে রাখার বদলে প্রোমোটারকে বেচে ফ্ল্যাট কিনে নিশ্চিন্ত হই । মানে, তাঁর হাতের জিনিস নিয়ে হাতাহাতি করতে পছন্দ করি ।

তবে ওই যে বলে না , কুঁজোরও ইচ্ছে করে চিত হয়ে শোবার, আর গামছারও ইচ্ছে করে ধোপাবাড়ি যাবার , তাই বুক ঠুকে কয়েক লাইন ইঞ্জিরি করে ফেললাম । মূল গানটি 'চরণধ্বনি শুনি তব, নাথ'।


I hear thy footsteps, O Lord,
In the silent reclusion of my life, in the fragrant breeze.
The stars and planets look on with a fixed gaze
The stream of thought flows slowly in the solitude of my heart.

My eyes look out like a thirsty and expectant bird,
I keep listening
, intently, in the depths of my existence;
I wait for that august morning when you shall appear before my soul
And my joys and sorrows shall immerse in the tide of happiness.
I hear thy footsteps, O Lord.

Sunday, March 5, 2017

বিয়ে নিয়ে


দিনের বেলা দিদাকে যে মাসি দেখাশোনা করেন, তাঁর মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে| মেয়েও কোনো বাড়িতে সারাদিন থাকার কাজ করেন, সেখানে যিনি রান্না করেন, তিনিই মেয়ের ঠাণ্ডা স্বভাব কম কথা ইত্যাদি দেখে মেয়েকে তাঁর পুত্রবধূ করতে চেয়েছেন| ছেলে প্রাইভেট গাড়ি চালায়, সিগারেট ছাড়া নাকি কোনো নেশা নেই| আজ বিকেলে তাঁদের কথাবার্তা বলতে আসার কথা, মাসি এসব বলছিলেন, আমি ঘুম ভেঙ্গে উঠে অতি বিস্বাদ চায়ের কাপ হাতে আর মা ক্লাস নিয়ে ফিরে খাবারের থালা হাতে শোনা হচ্ছিল| যে মাসি ঘর পরিষ্কার করেন,  তিনিও বসে দু-চারটে টিপ্পনী কাটছিলেন|
সর্ববাদিসম্মত সিদ্ধান্ত হল, ছেলে সম্পর্কে ভালো করে খোঁজখবর নেওয়া দরকার, বিশেষতঃ যখন সম্বন্ধটা যেচে এসেছে| বিয়ের ব্যাপারে পাত্রপক্ষের অতিরিক্ত আগ্রহ এবং তাড়াহুড়ো, দুটোই সমান সন্দেহজনক, আমাদের চেনাজানার মধ্যে তার উদাহরণ আছে| আমি আরও বলতে যাচ্ছিলাম মেয়েকে চাকরি ছাড়তে যেন বাধ্য না করা হয়, তার আগেই মা জিগ্যেস করলেন, ‘তোমার মেয়ে কি বলে?’
‘মেয়ের তো ন’ভাগ না, আর এক ভাগ হ্যা| বলে আমি চাকরি করে খাচ্ছি, বিয়ের আর কি দরকার?’ এক নিশ্বাসে বলে মাসি হাঁফ ছাড়েন| এ ব্যাপারে মেয়ের সঙ্গে বেশ ভালোমতো দড়ি টানাটানি হয়ে গেছে, অনুমান করা যায়|
বিয়ে করার চেয়ে চাকরি করাটা মেয়েদের যে সত্যিই বেশি দরকারি, এই কথাটা আমিও বলতে যাব, এমন সময়ে মা বলে উঠলেন, ‘তা চাকরি করে তো করে, বিয়ে করতে হবে না? বিয়েটা সকলের জীবনেই খু, খু-উব দরকারি|’
মায়ের এই ব্যাপারটা আমি সত্যিই বুঝতে পারি না| আমার মা, ঋজু, শক্ত, পেশাগতভাবে চূড়ান্ত সফল মা, সংসার নিয়ে নাজেহাল হয়ে যাওয়া মা তবু কেন যে বিয়ে করার পক্ষেই বরাবর সওয়াল করেন, এটা আমার মাথায় ঢোকে না| ‘বিয়ে করে কি চতুর্বর্গ লাভটা হয়, এই নিয়ে তক্কো করতে যাব, মা তাঁর আগের কথাটার খেই ধরেন, ‘একটা সঙ্গী লাগে না মানুষের? আপদেবিপদে শরীর খারাপে আহা-ষাট বলারও তো লোক একটা চাই, না কি?’
এই কথাটার প্রতিবাদ না করে থাকতে পারি না, আমার বিপ্লবী সত্তা ঘুম ভেঙ্গে একেবারে গা ঝেড়ে উঠে বসে| সংসারসমরাঙ্গনে মায়ের লড়াইয়ের বেশির ভাগটাই যে একার, একেবারে একার চেষ্টায় লড়া, সেটা আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না বলেই বোধ হয় আমি মুখ বেঁকিয়ে বলে ফেলি, ‘আ-হা, ক-ত একেবারে আহা-ষাট করে উল্টে দিচ্ছে লোকে! আহা-ষাট করার জন্যে বিয়ে করতে হবে?’
মাকে তর্কে হারাব আমি? ন্যায়্দর্শনের ডাকসাইটে প্রোফেসরকে? মায়ের ঠোঁটে এবার একটা মিচকে হাসি খেলে যায় – ‘ তা ঝগড়া করার জন্যেও তো একটা লোক দরকার, না কি?’
এবার চুপ করে যাই| এই লজিকটা আমার বেশ, বে-শ পছন্দ হয়ে যায়| আফটার অল, ওই ‘ইউ ক্যানট ব্লেম গড এন্ড মোদী ফর এভরিথিং’ গোছের মিমগুলোও এরকমই কিছু বলে, তাই না?

Friday, February 24, 2017

ঘরে ফেরার গান

(এই পোস্টটা অনেক অ-নেক দিন আগে হওয়ার কথা ছিল| কিন্তু (অ) কাজের চাপ, ল্যাদের প্রবল প্রভাব, বিলেতফেরত বন্ধুর সঙ্গে অনর্গল আড্ডা, বিয়েবাড়ি, সর্দিজ্বর প্রভৃতির ধাক্কা সামলে লিখতে লিখতে বেলা গেল| আপাততঃ কাজ নেই বা করতে ইচ্ছে করছে না, মাথা ধরেছে, ঠাণ্ডায় ল্যাব ছেড়ে বেরোতেও গড়িমসি, তাই ভাবলাম এখন লিখে ফেলা যাক|
মনে রাখতে হবে, এই লেখায় 'আজ' মানে ১৩ই জানুয়ারী, ২০১৭)
আজ আই আই টি খড়গপুরের পুনর্মিলন উত্সব - যাকে পোশাকি ভাষায় বলে এন্যুয়াল এলামনি মীট| প্রতিবছরই এই উত্সব হয়, তবে কিনা এই প্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক প্রাক্তন ছাত্রকে একসাথে জায়গা করে দেওয়া অসম্ভব, তাই কয়েকটি বছর বেছে নিয়ে সেই বছরের স্নাতকদের নিয়ে রি-ইউনিয়ন হয়| পুরনো ছাত্রছাত্রীরা সপরিবারে আসেন, খাওয়াদাওয়া করেন, ক্যাম্পাস ঘুরে দেখেন, স্মৃতিতাড়িত হন, তারপর ফিরে যান যে যাঁর জায়গায়| অধিকাংশই পেশাগতভাবে চূড়ান্ত সফল, অনেকেই দেশের মায়া কাটিয়েছেন বহুকাল| তবু কোনো এক আকর্ষণে তাঁরা ফিরে ফিরে আসেন কলেজবেলাটুকুকে আরেকবার ছুঁয়ে দেখতে|
২০১৭য় এসেছেন '৫৭, '৬৭, '৭৭ ও '৯২ সালে স্নাতক হয়েছিলেন যাঁরা| বেশির ভাগই পক্ককেশ, কেউ লাঠি নিয়ে হাঁটেন, অনেকেরই মধ্যদেশ রীতিমত স্ফীত, মুখে বয়সের নির্দয় আঁকিবুঁকি| কিন্তু উত্সাহের অন্ত নেই কারোরই, বয়স হার মেনেছে উদ্দীপনার কাছে| স্টেজে উঠে কেউ গাইছেন মহম্মদ রফির গান, কেউ গুনগুন করছেন গীতা দত্তের সুর, '৯২ সালে স্নাতক একজন শোনালেন অতি উত্কৃষ্ট গিটার, বর্তমান ছাত্রদের সঙ্গে প্রায় পাল্লা দিয়েই| এক এক জন স্টেজে উঠছেন, আর দর্শকাসনে সশব্দ উল্লাসে ফেটে পড়ছেন তাঁর সতীর্থরা, সেই কলেজদিনের মতই| অনুষ্ঠানশেষে খাওয়াদাওয়ার সময়েও একই ছবি| বহুদিন-পর-দেখা-হওয়া বন্ধুকে জড়িয়ে ধরছেন কোনো মধ্যবয়সী, ছাত্রজীবনের মতই উচ্ছল হয়ে উঠছেন গল্পে| এমনকি, খাওয়ার পরে বাসে চড়ে হোস্টেল ঘোরার যে ব্যবস্থা থাকে, তাকেও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একদল পায়ে হেঁটেই বেরিয়ে পড়লেন, হাবভাব দেখে মনে হল রাতে কিঞ্চিত বে-এক্তিয়ার হওয়ার প্ল্যানও রয়েছে বিলক্ষণ| এঁদের মধ্যে অনেকেই আজ রাত জাগবেন, যেমনটি শাসন করতেন তরুণবেলায় মধ্যরাতের রাজপথ| মাইকে গান বাজছে , ' মেরি সপনো কি রানি কব আয়েগি তু -'
এঁদের দেখে, এঁদের অফুরান এনার্জি দেখে ভালোও লাগে, আবার চিন্চিনে মনখারাপও হয়| আমারও একদিন হবে, এরকম? চোখে ছানি পড়বে, চুলে রূপোলী রেখা, হাঁটতে হবে লাঠি হাতে? সেদিন হোস্টেলের পুরনো বন্ধুকে দেখে আনন্দ হবে, এরকম? কেমন লাগবে, নিজের ছেড়ে-যাওয়া ঘর, ফেলে-আসা ক্যাম্পাসের মুখোমুখি হতে? যা যায়, তা তো আর ফেরে না, অন্ততঃ ঠিক তেমনটি করে তো নয়ই, তবু মাঝরাতে টু পয়েণ্ট টু হেঁটে যেতে কি তেমনিই লাগবে যেমন এখন লাগে? আমি পাল্টাব, ক্যাম্পাসও, আমাদের মাঝের বাঁধনটাও পাল্টে যাবে কি? তারচেয়ে না ফিরলেই, ফিরে না দেখলেই কি ভালো হবে? কম হবে, মনখারাপ?
আমার কলেজবেলার সই একবার যাদবপুরের রিইউনিয়নে পুরনো ছাত্রছাত্রীদের দেখে মনকেমন করে ওঠায় আমাকে বলেছিল, ভাবতে পারিস, কুড়ি বছর বাদে আমরা কে কোথায় ? কুড়ি বছর তো অনেক বেশি সময়, আজ দশ বছর বাদেই সে অন্য দেশে স্বামীপুত্তুর নিয়ে সংসার করছে, আমার মাথার সামনেটা ফাঁকা হয়ে এল| এককালে তার হোস্টেলের ঘরে যেতুম, এখন ফেসবুকে যোগাযোগ হয়|
জীবন যখন যাবে কুড়ি কুড়ি বছরের পার, যখন সব পাখি সব নদী ঘরে ফিরবে, তখন হয়ত সত্যিই নেড়েচেড়ে দেখতে ভালো লাগবে আমাদের যাদবপুরের সবুজ মাঠের আড্ডা, ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস, প্রথম চাকরি পাওয়ার পর সবাই মাইল কোল্ড ড্রিংক খেতে যাওয়ার আনন্দ, খড়গপুরে রাত জেগে রিহার্সাল, স্প্রিং ফেস্টে নাচানাচি, মানঅভিমান বেড়াতে যাওয়া ভোর চারটে অবধি আড্ডা| হয়ত আমরা ছাতা লাঠি গাঁটের ব্যথা সামলে আবার ফিরব আমাদের যৌবনের উপবনে, পুরনো বন্ধুকে দেখে খুব খুশি হয়ে জড়িয়ে ধরব, মাঝরাত অবধি চলবে হুল্লোড়|
সে যতই পরেরদিন এন্টাসিড খেতে হোক না কেন|

ন হন্যতে

- মমমম –
- আঃ, কি হচ্ছে কি !
- উমমম –
- ধ্যাত, কি যে করো না ! সরো, সরো বলছি!
- উমমম... হুমমম, তুমি সরে এসো -
- উফ, বয়েস বাড়ছে আর আদিখ্যেতা বাড়ছে তোমার! ছাড় বলছি!
- যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক, আমি তোমায় ছাড়ব না – হু হু –
- বুড়োবয়েসে কি মাথাটা গেছে? দরজাটা খোলা, সে আক্কেল আছে? পাশের ঘরে ওরা শুনতে পেলে?
- শোনার জন্যে কান খাড়া করে আছে যেন! রাত দুটোর আগে ঘরের আলো নেভে না, দেখোনি?
- ইশ, হি হি হি, সেদিন আলো নেভানোর পরেও তো –
- আজ ব্যাপার কি বলো দেখি? এত সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়ল দুটোতে? ঝগড়াঝাঁটি হল, নাকি?
- তোমার কি খেয়েদেয়ে কাজ নেই? এই মাঝরাত্তিরে ছেলেবউয়ের ঘরে কি হচ্ছে না জানলে ভাত হজম হচ্ছে না তোমার? ঘুমোও না বাপু|
- উফ, গিন্নী, তুমি এমন আনরোম্যান্টিক না! ওরা ঘুমোচ্ছে, আমরা আজ রাত জাগি বরং? এই রা-আ-ত তোমার আমা-আ-আর -
******************************
শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং রুমের আলোটা জ্বালে শুভজিত| একটা ভর্তি বোতল নিতে হবে, শ্রুতি আজ ঘরে জল নিয়ে যেতে ভুলে গেছে| অজান্তেই পাশের ঘরটার দিকে চোখ চলে যায় তার| পর্দাটা হাওয়ায় উড়ছে, এঘরের আলোয় দেখা যাচ্ছে দেওয়ালে টাঙানো ছবিদুটো |‘তিনটে দিন তোর বাবাকে না দেখলে আমার মনকেমন করে’, মা বলেছিল|

ডবল ফেলুদা

এ সিনেমাটার রিভিউ খেলিয়ে লেখার কোনো মানেই হয় না| জাস্ট কতটা খারাপ লেগেছে সেটুকু বললেই যথেষ্ট হবে|
১| কাহিনী – শ্রীসত্যজিত রায়| যে দুটো গল্প নিয়ে ছবি (সমাদ্দারের চাবি আর গোলকধাম রহস্য), সেগুলো কোনো অবস্থাতেই প্রথমসারির ফেলুদাকাহিনীর মধ্যে পড়ে না, না প্লটে, না গল্পের বাঁধুনিতে| তবে কিনা জটায়ু পাওয়া যাচ্ছে না, অতএব হাফ এ বেল ইজ বেটার দ্যান নোবেল এই লজিক মেনে পরিচালকমশাই এই দুটোকে বেছেছেন| যাঁরা গল্প পড়েছেন, তাঁদের ছবিটা দেখতে বসে হাই না তোলার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই| দশে সাড়ে ছয়|

২| চিত্রনাট্য – পুরোনো ‘সন্দেশ’-এ সত্যজিত লিখেছিলেন কিভাবে গল্প থেকে চিত্রনাট্য তৈরী করতে হয়| মূল বক্তব্যটা ছিল, গল্পে পাঠকের কল্পনা করে নেওয়ার জায়গা থাকে, কিন্তু সিনেমায় সবকিছুই চোখের সামনে দেখাতে হয়, ‘রাম ভালো ছেলে’ বললেই গল্পের প্রয়োজন মিটে যায়, সিনেমায় তার ভালো কাজের নমুনা দেখানোর দরকার পড়ে| সাহিত্য আর সিনেমা যে দুটি আলাদা মাধ্যম, সেটা সহজ ভাষায় বোঝানোর জন্যে এর চেয়ে ভালো লেখা কমই আছে| পরিচালক এই লেখাটা আরেকবার ঝালিয়ে নিলে ভালো করবেন, গল্প থেকে হুবহু টুকে দেওয়ার অভ্যেসটা ছাড়বেন| সোনার কেল্লা বা জয় বাবা ফেলুনাথ দেখলেও একই ফল হওয়ার কথা| দশে ছয়|

৩| পরিচালনা – সন্দীপ রায় পরিচালক হিসেবে মোটেই ফেলে দেওয়ার মত নন, ‘নিশিযাপন’, ‘যেখানে ভূতের ভয়’, ‘চার’ ইত্যাদি ছবি বানিয়ে তিনি সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন| কিন্তু ফেলুদাটা সত্যজিত ঢের ঢের ভালো বানাতে জানতেন, এটা এবার তাঁকে মেনে নিতেই হবে| গোয়েন্দাগল্পে ডিটেলিংয়ের এত অভাব কেন? কেন ছবির টাইটেল কার্ডে লেখা হয় 'গোলোকধাম' আর বাড়ির দরজায় দেখানো হয় 'গোলকধাম' ? 'আমার কাছে এলে কেন, ইঁদুরের ঘেঁটি ধরে নাড়লেই তো সব পেয়ে যেতে' - এটা সিধুজ্যাঠা না বললে ফেলুদা শিখবে না? দশে সাড়ে পাঁচ|

৪| অভিনয় – সব্যসাচীর ফেলু ভুঁড়ির ভারে কিঞ্চিত ভারাক্রান্ত হয়েও ধারে কাটছেন| সাহেবের পরিণত মুখে তোপসের টিনএজারসুলভ হাবভাব বিসদৃশ, এবং তিনি যদি ফেলুদা সিরিজে অভিনয় করে যেতে চান, বাংলা উচ্চারণটা ভালো না করে তাঁর উপায় নেই| ব্রাত্য বসুর মণিমোহন চলনসই, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় ছোট্ট ভূমিকায় জাত চিনিয়েছেন| পরান বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিধুজ্যাঠা বিশ্বাসযোগ্য| তবে ধৃতিমানের নীহারবাবু আর গৌরব চক্রবর্তীর রণজিত এই ছবির সবচেয়ে উজ্জ্বল দুটি চরিত্র| যদি ঠিকঠাক সিনেমা বেছে নিতে পারেন, বাংলা ছবিতে গৌরবের ভবিষ্যত যথেষ্ট ঝকঝকে না হওয়ার কোনো কারণ নেই| দশে সাড়ে সাত|

৫| সঙ্গীত – একটা গোয়েন্দাকাহিনী এরকম ন্যাড়াবোঁচা কেন? কেবল ফেলুদার সিগনেচার টিউন বাজালেই কাজ শেষ? বাকি সময়টা আবহসঙ্গীতের কোনো প্রয়োজন নেই? এমনকি বাইক চেজের সময়েও নয়? দেখতে বসে এক এক সময়ে মনে হচ্ছিল, হড়বড় করে বানানো টেলিফিল্ম দেখছি| দশে টেনেটুনে সাড়ে চার|


এ ছবি নাকি ফেলুদার সিনেমায়িত হওয়ার পঞ্চাশ বছর উদযাপন করছে, তাই ছবির শেষে আগের ফেলুছবির কুশীলবদের দিয়ে দু-চার কথা বলানো হয়েছে| পরিচালক ভেবেছিলেন পুরনো তোপসে, ক্যাপ্টেন স্পার্ক, মুকুল, এবং সেই ছেলেটি যাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ভবানন্দের দল 'মিসটেক, মিসটেক' বলে ফেরত দিয়ে গিয়েছিল, এদের দেখালে দর্শককে খানিকটা সেন্টিমেন্টাল করে দেওয়া যাবে, কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা ব্যুমেরাং হয়ে গিয়েছে, অভিনেতারা (বা প্রাক্তন অভিনেতারা) কেবল 'মানিককাকু/ মানিকজ্যেঠু' সম্পর্কেই বলে গেলেন, বর্তমান নিয়ে একটি কথাও খরচ করলেন না|
সিনেমাটা কেমন হয়েছে সে তো বুঝতেই পারছেন| যদি ভুল করেও দেখে ফেলেন, ডিটক্স করতে একবার ‘সোনার কেল্লা’ দেখে ফেলবেন, তাহলেই দোষ যাবে কেটে|

কথাবার্তা

রাতে খেতে বসে কথা হচ্ছিল৷ মামা সর্ষেবাটা কই দিয়ে গেছেন টিপিনকৌটোয় পুরে, তাই খেয়ে হাত চাটতে চাটতে ওদের রান্নার লোকের ভূয়সী প্রশংসা চলছিল অার যেহেতু নদীর এপার কহে ইত্যাদি, নিজেদের বাড়ির রান্নার মাসিকে ন ভূতো ন ভবিষ্যতি করছিলাম (অবশ্য কইমাছ দূরে থাক, ভুল করে সে অালুরদম ভালো রেঁধে ফেললেই অামরা ধন্য হয়ে যাই)৷
— অামাদের কপালটাই এমন ৷ অামার সুচিন্তিত মন্তব্য৷ অামার রান্নার দৌড় ডিমসেদ্ধ পর্যন্ত, অতএব কমেণ্ট করবার অধিকার অাছে৷

মা ব্যাপারটাকে অারেকটু ক্ল্যারিফাই করেন৷ হাজার হোক সংস্কৃতের ডাকসাইটে অধ্যাপক, ভাষার ওপর দখল অামার চেয়ে দেড় লক্ষ গুণ বেশি৷
— কপাইল্যার এমন কপাল,
গাই বিয়াইল দামড়া বাছুর, বউ বিয়াইল অাবাল৷
শেষ শব্দটি শুনে কান খাড়া হয়ে ওঠে৷ 'অা' সমেত এবং 'অা' ছাড়া, দুভাবেই শব্দটা শোনা, এবং কোনো অবস্থাতেই সেটা বিশেষ ইয়ে নয়৷ অামার ধারণা ছিল 'অা' সমেত শব্দটা নিতান্তই হাল অামলের ভাষার মাত্রা, ব্যাপারটা তাহলে তা নয়?
অগত্যা মায়ের শরণ নিই৷ অামার বাংলা শেখার শুরু এবং শেষ যিনি৷ নিতান্ত ন্যাদোশের মত মুখ করে শুধোই
— গাই বিয়োল মানে তো বুঝলাম, বাকিটার মানে কি দাঁড়াল?
অামার সীমাহীন অজ্ঞতায় মা অাহত হন ৷ তাঁর ভেতরের শিক্ষকসত্তা গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে৷
— বউ বিয়াইল অাবাল , মানে বউয়ের মেয়ে হয়েছে৷ তখন মেয়েদের খুব একটা ইয়ে করা হত না তো —
চুপ করে থাকি৷ শব্দটা তখনও গালাগালই ছিল তাহলে৷

খেলাধুলো

ইয়ে .. সবাই খেলছে তাই ...
Tattoos.......... না| ছুঁচ ফোটানোর ভয়ে তো বটেই, ট্যাটু আঁকানোর চেয়ে মোছা ঢের বেশি কঠিন, সেই কারণেও| আজ যা আমার ভালো লাগছে, পাঁচ বছর পর সেইটা ঠিক সেইভাবেই ভালো লাগবে, এরকম চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে আমার খুব একটা ভরসা নেই, তাই | কিছু জিনিস অবিশ্যি আছে যেগুলোর প্রতি ভালোলাগা চুল্লিতে ঢোকা পর্যন্ত নড়চড় হওয়ার আশংকা নেই, কিন্তু সেগুলোকে হাতেপায়েপিঠে বয়ে বেড়ানোর পক্ষপাতী নই, তাই|
Surgeries............... এই মেরেছে| না, না, না| মায়ের দুখানা হয়েছিল, কষ্ট দেখে বুঝেছি ও জিনিস না হওয়াই ভালো| তা সে যতই হাসপাতালে ভালো ভালো খেতে দিক না কেন| 
Broken a bone......... নাঃ| একবার পা মচকেছিল বটে, সুদর্শন ডাক্তার হেসে এও বলেছিলেন - তিনদিন রেস্ট - কিন্তু আমি তার পরদিনই নাচতে নাচতে পুজোর বাজার করতে চলে গেছিলাম | ফল ? ডান পা-টা একটু কমজোরি হয়েই আছে, বেশি চাপ পড়লেই ব্যথা করে|
Fell in love........... উফ্, এত হাঁড়ির খবর বলতে হলে তো বিপদ! হ্যা রে বাবা| পনেরয় একবার, পঁচিশে আর একবার| হল ? পয়ত্রিশ এখনো হয়নি, হলে কি হবে বলা যাচ্ছে না|
Had been heart broken in love....দ্যাখো বাপু, বঁটিতে মাছ কুটব আর একবারও রক্তারক্তি হবে না এরকম হয় নাকি? ও সকলেরই হয়, আমারও হয়েছে| আসল কথাটা হল, কার হাতের রক্ত কত জলদি বন্ধ হয়|
Skipped school......... পাগলা নাকি? আমি কি স্কুলে একা একা যেতুম নাকি যে স্কুল কাটব? কলেজে অবিশ্যি দুটো একটা ক্লাস মাস বাংক মেরেছি, পরে বুঝেছি আরও বেশি মারলেও রেজাল্টের বিশেষ হেরফের হত না| বরং যারা ক্লাস কেটে মাঠে আড্ডা মেরেছে, আমি তাদের হিংসে করি| আজও|
Watched someone die........না| ভাগ্যিস!
Ridden in an ambulance..... না। চাপতে চাইও না| শোয়া-বসা কোনো অবস্থাতেই নয়|
Sang karaoke............ হ্যা| বিশেষ সুবিধে হয় নি বলাই বাহুল্য|
Have a pet......... ছোটবেলায় কুকুর ঘোড়া হাতি অনেককিছু পোষার কথাই ভেবেছিলাম, গ্যারেজে হাতিটার জায়গা হবে কিনা এরকম একটা ক্যালকুলেশনও মাথায় ঘুরেছিল, কিন্তু মায়ের এক কথা - আমি তোমার যত্নই করতে পারি না, আবার আরেকটা জানোয়ারের (নোট দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ ) যত্ন করব কি করে? মা কুকুরের কথাই ভেবেছিলেন, অফ কোর্স|
Been skiing............... হল আর কই? শুধু বন্ধুদের ছবি দেখেই দিন গেল| জঘন্য|
Been skating.................. সেও হয়নি| ইউটিউবে দেখেই শখ মেটাই|
Rode a horse - ইয়েসসস| ঝিলমিল - এ (তখনও নিক্কো পার্ক হয়নি), প্রথমবার| ঘোড়া দুলকি চাল ছেড়ে হালকা ছোটা শুরু করতেই জিন আঁকড়ে গান শুরু করেছিলাম - খরবায়ু বয় বেগে| (গান গাইলে ঘোড়া ফেলে দেবে না একথাটা কে শিখিয়েছিল মনে নেই)
দ্বিতীয়বার দার্জিলিং-এর ম্যাল-এ| এ ঘোড়া বেশ জোরেই দৌড়েছিল, জিনের ঘষা খেয়ে আমার প্রাণ যায় আর কি| সেই থেকে না, যাঁরা ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধু করেছেন তাঁদের প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা| এক হাতে লাগাম, গায়ে একমণি যুদ্ধের পোশাক, হাতে আড়াইগজি তলোয়ার, আর পশ্চাদ্দেশে ক্রমাগত জিনের ঘষা খাওয়া - সবগুলো কো-অর্ডিনেট করা কি মুখের কথা?
আর হ্যা, আমি উটেও চড়েছি| পুরীতে| হাতিটা বাকি আছে|
Stayed in a hospital......... হ্যা| তবে সময়টা ভুলে যেতে চাই| পুরোপুরি|
Rode in the back of a police car..... ন্যাহ| যদিও ট্যাক্সিড্রাইভারকে পুলিশের ভয় দেখিয়ে মিটার ঠিক করিয়েছি একাধিকবার|
Ever kissed in public....... লে হালুয়া! বলব কেন?
Ever got drunk...... না| না| এবং না| লুকোনো ফ্রাস্ট্রেশান বের করে দেওয়ার অন্য রাস্তা আছে নিশ্চয়|
Travelled without ticket...... একবার ভুল করে| সেবার ধরা পড়িনি| আর একবার টিকিট কেটে ব্যাগে খুঁজে পাইনি - অতএব ফাইন|
Danced all night........... আঃ, বলছি না পায়ে ব্যথা ? ঠ্যাং খুলে গেলে লাগিয়ে দেবে কেডা ?
Stopped if a cat crossed Ur path.......কয়েকবার করে দেখেছি, কপাল যে পোড়া সেই পোড়াই| আজকাল করি না| বেড়ালও রাস্তা পার হয়, আমিও হই|
Written a book............ ইচ্ছে তো করেই, শুধু কেউ আমায় সময় আর আইডিয়া দাও না গো ? ল্যাদটাও কাটিয়ে দিতে পারলে ভালো হয়|
Danced on the street......ইচ্ছে আছে একবার পাড়ার ভাসানে বেদম নাচব| কবে হবে, জানা নেই|
আর আছে, প্রশ্ন?