(ফেসবুক হইতে পুনঃপোষ্টিত - পুরনো লেখা)
যখন স্কুলে পড়তাম, তখন প্রথম
শুনলাম ভ্যালেন্টাইন ডে-র কথা, যদিও তখন ভালবাসার মানে আর্চিজ গ্যালারী হয়ে ওঠেনি, কলকাতার কাপলরা
সাউথ সিটির বদলে ঢাকুরিয়া লেকে প্রেম করত, প্রথম কথা বলার দিনে পাড়ার দোকান থেকে
দু-টাকার কার্ড কিনে নিয়ে যেত| তার পর এল ফ্রেন্ডশিপ ডে| স্কুলশুদ্ধু সক্কলে দেখি এ ওকে ‘ফ্রেন্ডস’ লেখা একখানা
তাগা পরাচ্ছে| কি আপদ রে বাবা!
ইদানিং তো হাগ ডে, রোজ ডে, কিস ডে কিছুই
বাদ যায় না|তবে সবচেয়েবড় গব্বযন্ত্রণা বোধ হয়
ঘটা করে মাদার্স ডে আর ফাদার্স ডে পালন| যাঁরা না থাকলে আমরা জাস্ট নেই হয়ে যেতাম, যাঁরা আমাদের জন্যে এত করেন যে হাজার
বছর অষ্টপ্রহর থ্যাঙ্ক ইউ বললেও যথেষ্ট হবে না, তাঁদের নিয়ে মাত্র একদিন মাতামাতি করার, তাঁদের কে কতটা ভালবাসে সর্বসমক্ষে
ঘোষণা করার মধ্যে একটা অশালীন আদেখলেপনা আছে|এ অনেকটা মাসের পর মাস রেওয়াজের ধার না
মাড়িয়ে হঠাত একদিন তানপুরোর কান মুচড়িয়ে আর্তনাদ বের করা|
তাই এটা ফাদার্স
ডে-র গল্প নয়|
বাবা কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচন্ড কড়া অথচ অসম্ভব ছাত্রদরদী অধ্যাপক, কিছুটা একগুঁয়ে, নিজের বিশ্বাসে ইঁটের মত শক্ত এবং ঠিক
সেই কারনেই সাংসারিক ব্যাপারে বেশ খানিকটা অনুপযুক্ত| কিন্তু এগুলো যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে
দেখেছেন তাঁরাই জানেন| এটা সে গল্প নয়| আমার অনুপস্থিতিতে আমার প্রিয় পাড়ার কুকুরকে বাবা নিয়ম করে
খাওয়ান, দরকারী কাগজ বাবার কাছে জমা রেখে দুজনেই ভুলে মেরে দিই, বাবার নেলকাটার, শ্যাম্পু, তোয়ালে আমি মাঝে মাঝেই বগলদাবা করি আর
সময়ে ফেরত দিই না, এটা সে গল্পও নয়| এটা বাবা আর মেয়ের গল্প| যেমন গল্প সব বাবা আর মেয়ের থাকে|
আমার বাবা
ভূতত্ত্ববিদ| সোজা বাংলায়, জিওলজিস্ট| জিওলজির ছাত্রছাত্রীরা জানেন, এই বিদ্যে কেবল ক্লাসরুমে শেখা যায় না, পড়াশোনার অঙ্গ হিসেবে মাঠে ঘাটে পাহাড়ে
ঘুরে সেসব জায়গার বৈশিষ্ট্য পরখ করে দেখতে হয়, এক বা একাধিক শিক্ষক সঙ্গে থাকেন| এর পোশাকি নাম ফিল্ড ট্রিপ, চলতিতে ফিল্ডে যাওয়া| বাবাও বিভিন্ন সময়ে সদলবলে ফিল্ড
ট্রিপ-এ গেছেন| যতদিন অবোধ ছিলাম ততদিন একরকম ছিল, গোলটা বাধল জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হওয়ার
পর|
আমার বয়েস তখন
বছর পাঁচেকের আশেপাশে| বাবা তাঁর দলবল নিয়ে গিয়েছিলেন যে জায়গায়, তার নাম যদ্দুর মনে পড়ে, রামগড়| তখন পোস্টকার্ড আর ইনল্যান্ডের যুগ| কয়েকদিন পর পর বাড়িতে ইনল্যান্ড আসত, ওপরে গোটা গোটা করে আমার নাম, ভিতরে ছাপার হরফের মতন হাতের লেখায়
কাজের সূত্রে কোথায় ঘুরলেন, কি দেখলেন তার বর্ণনা| সেখানে হিতোপদেশ নেই, কেবল অনাবিল বন্ধুত্বের সংলাপ| কারো কাছ থেকে গোটা একখানা চিঠি পাওয়া
সেই আমার জীবনে প্রথম|
কিন্তু চিঠি
পেলে হবে কি, তাতে কি মানুষটার অভাব মেটে? মা-র কাছে শুনেছি, বাবার আদুরে কন্যা সেই সময়টায় সারারাত
ভালো করে ঘুমোত না, এপাশ-ওপাশ করে কাটাত| যেদিন বাবা ফিরলেন, সেদিন সে প্রায় নাক ডেকে ঘুমিয়েছিল (মায়ের কথায়, ‘সারারাত যাত্রা দেখে পরেরদিন লোক যেমন
ঘুমোয়’)| সেটা জানার পর বাবা আর কোনোদিন ফিল্ডে যাননি| ফিল্ড ট্রিপের নানা মজার ঘটনা বহুবার
বলতে শুনেছি, কিন্তু একটিবারের জন্যও আক্ষেপ করেননি আর যাওয়া হয়নি বলে|
এই পরিণত (?) বয়সে এসে বুঝি, কাজের জায়গাতেও নিশ্চয় অসুবিধে হয়েছিল, সমালোচনা হয়েছিল এমন অবস্থানের ফলে| কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টান নি, শুধু নিজের শিশু মেয়েকে নিশ্চিন্ত, নির্ভার, নিটোল রাতের ঘুম উপহার দেবেন বলে|
No comments:
Post a Comment