(এই পোস্টটা অনেক অ-নেক দিন আগে হওয়ার কথা ছিল| কিন্তু (অ) কাজের চাপ, ল্যাদের প্রবল প্রভাব, বিলেতফেরত বন্ধুর সঙ্গে অনর্গল আড্ডা, বিয়েবাড়ি, সর্দিজ্বর প্রভৃতির ধাক্কা সামলে লিখতে লিখতে বেলা গেল| আপাততঃ কাজ নেই বা করতে ইচ্ছে করছে না, মাথা ধরেছে, ঠাণ্ডায় ল্যাব ছেড়ে বেরোতেও গড়িমসি, তাই ভাবলাম এখন লিখে ফেলা যাক|
মনে রাখতে হবে, এই লেখায় 'আজ' মানে ১৩ই জানুয়ারী, ২০১৭)
মনে রাখতে হবে, এই লেখায় 'আজ' মানে ১৩ই জানুয়ারী, ২০১৭)
আজ আই আই টি খড়গপুরের পুনর্মিলন উত্সব - যাকে পোশাকি ভাষায় বলে এন্যুয়াল এলামনি মীট| প্রতিবছরই এই উত্সব হয়, তবে কিনা এই প্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক প্রাক্তন ছাত্রকে একসাথে জায়গা করে দেওয়া অসম্ভব, তাই কয়েকটি বছর বেছে নিয়ে সেই বছরের স্নাতকদের নিয়ে রি-ইউনিয়ন হয়| পুরনো ছাত্রছাত্রীরা সপরিবারে আসেন, খাওয়াদাওয়া করেন, ক্যাম্পাস ঘুরে দেখেন, স্মৃতিতাড়িত হন, তারপর ফিরে যান যে যাঁর জায়গায়| অধিকাংশই পেশাগতভাবে চূড়ান্ত সফল, অনেকেই দেশের মায়া কাটিয়েছেন বহুকাল| তবু কোনো এক আকর্ষণে তাঁরা ফিরে ফিরে আসেন কলেজবেলাটুকুকে আরেকবার ছুঁয়ে দেখতে|
২০১৭য় এসেছেন '৫৭, '৬৭, '৭৭ ও '৯২ সালে স্নাতক হয়েছিলেন যাঁরা| বেশির ভাগই পক্ককেশ, কেউ লাঠি নিয়ে হাঁটেন, অনেকেরই মধ্যদেশ রীতিমত স্ফীত, মুখে বয়সের নির্দয় আঁকিবুঁকি| কিন্তু উত্সাহের অন্ত নেই কারোরই, বয়স হার মেনেছে উদ্দীপনার কাছে| স্টেজে উঠে কেউ গাইছেন মহম্মদ রফির গান, কেউ গুনগুন করছেন গীতা দত্তের সুর, '৯২ সালে স্নাতক একজন শোনালেন অতি উত্কৃষ্ট গিটার, বর্তমান ছাত্রদের সঙ্গে প্রায় পাল্লা দিয়েই| এক এক জন স্টেজে উঠছেন, আর দর্শকাসনে সশব্দ উল্লাসে ফেটে পড়ছেন তাঁর সতীর্থরা, সেই কলেজদিনের মতই| অনুষ্ঠানশেষে খাওয়াদাওয়ার সময়েও একই ছবি| বহুদিন-পর-দেখা-হওয়া বন্ধুকে জড়িয়ে ধরছেন কোনো মধ্যবয়সী, ছাত্রজীবনের মতই উচ্ছল হয়ে উঠছেন গল্পে| এমনকি, খাওয়ার পরে বাসে চড়ে হোস্টেল ঘোরার যে ব্যবস্থা থাকে, তাকেও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একদল পায়ে হেঁটেই বেরিয়ে পড়লেন, হাবভাব দেখে মনে হল রাতে কিঞ্চিত বে-এক্তিয়ার হওয়ার প্ল্যানও রয়েছে বিলক্ষণ| এঁদের মধ্যে অনেকেই আজ রাত জাগবেন, যেমনটি শাসন করতেন তরুণবেলায় মধ্যরাতের রাজপথ| মাইকে গান বাজছে , ' মেরি সপনো কি রানি কব আয়েগি তু -'
এঁদের দেখে, এঁদের অফুরান এনার্জি দেখে ভালোও লাগে, আবার চিন্চিনে মনখারাপও হয়| আমারও একদিন হবে, এরকম? চোখে ছানি পড়বে, চুলে রূপোলী রেখা, হাঁটতে হবে লাঠি হাতে? সেদিন হোস্টেলের পুরনো বন্ধুকে দেখে আনন্দ হবে, এরকম? কেমন লাগবে, নিজের ছেড়ে-যাওয়া ঘর, ফেলে-আসা ক্যাম্পাসের মুখোমুখি হতে? যা যায়, তা তো আর ফেরে না, অন্ততঃ ঠিক তেমনটি করে তো নয়ই, তবু মাঝরাতে টু পয়েণ্ট টু হেঁটে যেতে কি তেমনিই লাগবে যেমন এখন লাগে? আমি পাল্টাব, ক্যাম্পাসও, আমাদের মাঝের বাঁধনটাও পাল্টে যাবে কি? তারচেয়ে না ফিরলেই, ফিরে না দেখলেই কি ভালো হবে? কম হবে, মনখারাপ?
আমার কলেজবেলার সই একবার যাদবপুরের রিইউনিয়নে পুরনো ছাত্রছাত্রীদের দেখে মনকেমন করে ওঠায় আমাকে বলেছিল, ভাবতে পারিস, কুড়ি বছর বাদে আমরা কে কোথায় ? কুড়ি বছর তো অনেক বেশি সময়, আজ দশ বছর বাদেই সে অন্য দেশে স্বামীপুত্তুর নিয়ে সংসার করছে, আমার মাথার সামনেটা ফাঁকা হয়ে এল| এককালে তার হোস্টেলের ঘরে যেতুম, এখন ফেসবুকে যোগাযোগ হয়|
জীবন যখন যাবে কুড়ি কুড়ি বছরের পার, যখন সব পাখি সব নদী ঘরে ফিরবে, তখন হয়ত সত্যিই নেড়েচেড়ে দেখতে ভালো লাগবে আমাদের যাদবপুরের সবুজ মাঠের আড্ডা, ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস, প্রথম চাকরি পাওয়ার পর সবাই মাইল কোল্ড ড্রিংক খেতে যাওয়ার আনন্দ, খড়গপুরে রাত জেগে রিহার্সাল, স্প্রিং ফেস্টে নাচানাচি, মানঅভিমান বেড়াতে যাওয়া ভোর চারটে অবধি আড্ডা| হয়ত আমরা ছাতা লাঠি গাঁটের ব্যথা সামলে আবার ফিরব আমাদের যৌবনের উপবনে, পুরনো বন্ধুকে দেখে খুব খুশি হয়ে জড়িয়ে ধরব, মাঝরাত অবধি চলবে হুল্লোড়|
সে যতই পরেরদিন এন্টাসিড খেতে হোক না কেন|
No comments:
Post a Comment