Friday, February 24, 2017

ডবল ফেলুদা

এ সিনেমাটার রিভিউ খেলিয়ে লেখার কোনো মানেই হয় না| জাস্ট কতটা খারাপ লেগেছে সেটুকু বললেই যথেষ্ট হবে|
১| কাহিনী – শ্রীসত্যজিত রায়| যে দুটো গল্প নিয়ে ছবি (সমাদ্দারের চাবি আর গোলকধাম রহস্য), সেগুলো কোনো অবস্থাতেই প্রথমসারির ফেলুদাকাহিনীর মধ্যে পড়ে না, না প্লটে, না গল্পের বাঁধুনিতে| তবে কিনা জটায়ু পাওয়া যাচ্ছে না, অতএব হাফ এ বেল ইজ বেটার দ্যান নোবেল এই লজিক মেনে পরিচালকমশাই এই দুটোকে বেছেছেন| যাঁরা গল্প পড়েছেন, তাঁদের ছবিটা দেখতে বসে হাই না তোলার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই| দশে সাড়ে ছয়|

২| চিত্রনাট্য – পুরোনো ‘সন্দেশ’-এ সত্যজিত লিখেছিলেন কিভাবে গল্প থেকে চিত্রনাট্য তৈরী করতে হয়| মূল বক্তব্যটা ছিল, গল্পে পাঠকের কল্পনা করে নেওয়ার জায়গা থাকে, কিন্তু সিনেমায় সবকিছুই চোখের সামনে দেখাতে হয়, ‘রাম ভালো ছেলে’ বললেই গল্পের প্রয়োজন মিটে যায়, সিনেমায় তার ভালো কাজের নমুনা দেখানোর দরকার পড়ে| সাহিত্য আর সিনেমা যে দুটি আলাদা মাধ্যম, সেটা সহজ ভাষায় বোঝানোর জন্যে এর চেয়ে ভালো লেখা কমই আছে| পরিচালক এই লেখাটা আরেকবার ঝালিয়ে নিলে ভালো করবেন, গল্প থেকে হুবহু টুকে দেওয়ার অভ্যেসটা ছাড়বেন| সোনার কেল্লা বা জয় বাবা ফেলুনাথ দেখলেও একই ফল হওয়ার কথা| দশে ছয়|

৩| পরিচালনা – সন্দীপ রায় পরিচালক হিসেবে মোটেই ফেলে দেওয়ার মত নন, ‘নিশিযাপন’, ‘যেখানে ভূতের ভয়’, ‘চার’ ইত্যাদি ছবি বানিয়ে তিনি সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন| কিন্তু ফেলুদাটা সত্যজিত ঢের ঢের ভালো বানাতে জানতেন, এটা এবার তাঁকে মেনে নিতেই হবে| গোয়েন্দাগল্পে ডিটেলিংয়ের এত অভাব কেন? কেন ছবির টাইটেল কার্ডে লেখা হয় 'গোলোকধাম' আর বাড়ির দরজায় দেখানো হয় 'গোলকধাম' ? 'আমার কাছে এলে কেন, ইঁদুরের ঘেঁটি ধরে নাড়লেই তো সব পেয়ে যেতে' - এটা সিধুজ্যাঠা না বললে ফেলুদা শিখবে না? দশে সাড়ে পাঁচ|

৪| অভিনয় – সব্যসাচীর ফেলু ভুঁড়ির ভারে কিঞ্চিত ভারাক্রান্ত হয়েও ধারে কাটছেন| সাহেবের পরিণত মুখে তোপসের টিনএজারসুলভ হাবভাব বিসদৃশ, এবং তিনি যদি ফেলুদা সিরিজে অভিনয় করে যেতে চান, বাংলা উচ্চারণটা ভালো না করে তাঁর উপায় নেই| ব্রাত্য বসুর মণিমোহন চলনসই, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় ছোট্ট ভূমিকায় জাত চিনিয়েছেন| পরান বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিধুজ্যাঠা বিশ্বাসযোগ্য| তবে ধৃতিমানের নীহারবাবু আর গৌরব চক্রবর্তীর রণজিত এই ছবির সবচেয়ে উজ্জ্বল দুটি চরিত্র| যদি ঠিকঠাক সিনেমা বেছে নিতে পারেন, বাংলা ছবিতে গৌরবের ভবিষ্যত যথেষ্ট ঝকঝকে না হওয়ার কোনো কারণ নেই| দশে সাড়ে সাত|

৫| সঙ্গীত – একটা গোয়েন্দাকাহিনী এরকম ন্যাড়াবোঁচা কেন? কেবল ফেলুদার সিগনেচার টিউন বাজালেই কাজ শেষ? বাকি সময়টা আবহসঙ্গীতের কোনো প্রয়োজন নেই? এমনকি বাইক চেজের সময়েও নয়? দেখতে বসে এক এক সময়ে মনে হচ্ছিল, হড়বড় করে বানানো টেলিফিল্ম দেখছি| দশে টেনেটুনে সাড়ে চার|


এ ছবি নাকি ফেলুদার সিনেমায়িত হওয়ার পঞ্চাশ বছর উদযাপন করছে, তাই ছবির শেষে আগের ফেলুছবির কুশীলবদের দিয়ে দু-চার কথা বলানো হয়েছে| পরিচালক ভেবেছিলেন পুরনো তোপসে, ক্যাপ্টেন স্পার্ক, মুকুল, এবং সেই ছেলেটি যাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ভবানন্দের দল 'মিসটেক, মিসটেক' বলে ফেরত দিয়ে গিয়েছিল, এদের দেখালে দর্শককে খানিকটা সেন্টিমেন্টাল করে দেওয়া যাবে, কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা ব্যুমেরাং হয়ে গিয়েছে, অভিনেতারা (বা প্রাক্তন অভিনেতারা) কেবল 'মানিককাকু/ মানিকজ্যেঠু' সম্পর্কেই বলে গেলেন, বর্তমান নিয়ে একটি কথাও খরচ করলেন না|
সিনেমাটা কেমন হয়েছে সে তো বুঝতেই পারছেন| যদি ভুল করেও দেখে ফেলেন, ডিটক্স করতে একবার ‘সোনার কেল্লা’ দেখে ফেলবেন, তাহলেই দোষ যাবে কেটে|

No comments:

Post a Comment