ইউটিউবে 'অপুর সংসার' (গেম শো) -র একটা এপিসোড দেখছিলাম । (শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের মতো অনবদ্য অভিনেতা গেম শো-র এঙ্কর হয়ে কাল কাটাচ্ছিলেন, বড়ো নিদারুণ ব্যাপার, কী আর করা যাবে । ) অতিথি হয়ে এসেছিলেন দুই কিংবদন্তী অভিনেত্রী - মাধবী মুখোপাধ্যায় এবং সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় । বাংলা ছবির স্বর্ণযুগে এঁরা দুজনেই রুপোলি পর্দা আলো করে রেখেছিলেন অভিনয়ের গুণে, এখনো হাঁকড়ে ব্যাটিং করছেন দুজনেই ।
সঞ্চালকের এক প্রশ্নের উত্তরে সাবিত্রী বলছিলেন, তাঁকে কিশোরীবয়সে বাংলা ছবিতে 'ভিড়ের মধ্যে' দাঁড়াতে হয়েছিল রোজগারের তাগিদে । নাচতেও হয়েছিল গ্ৰুপে। তার বদলে পেয়েছিলেন ১৫ টাকা ।
উত্তরে শাশ্বত যা বললেন, সেটা সম্ভবতঃ এই নেপোটিজম-অভিযোগলাঞ্ছিত দুনিয়ায় বাঁধিয়ে রাখার মতো ।
- সাবিত্রী চ্যাটার্জিকে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে শুরু করতে হয়েছিল! এসব শুনলে মনে হয়, আমরা অনেক ভালো আছি । ... যাঁরা আজ ভিড়ের মধ্যে দাঁড়াচ্ছেন এবং আক্ষেপ করছেন যে কেন আমি বড় চরিত্র পাচ্ছি না, তাঁরা একটু লড়ে যান । দেখবেন, একদিন না একদিন পাবেন । সাবিত্রী চ্যাটার্জি হওয়া সকলের পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু শাশ্বত চ্যাটার্জি অন্ততঃ হতে পারবেন।
এই এপিসোড আমি সেদিন থেকে প্রায় অন লুপ দেখছি এবং শুনছি । এবং সেটা এই কটি কথা বার বার শোনার জন্যই । (সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় এখনো হাঁটুর বয়সী বহু অভিনেতাকে গুণে গুণে একশো গোল দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, 'প্রাক্তন'এ তাঁর 'কামরামে বহুত আরশোলা হ্যায়, ফুর ফুর ফুর ফুর করকে উড়তা হ্যায়' অবিস্মরণীয় । )
তা মাধবী-সাবিত্রী আসবেন আর উত্তমকুমারের প্রসঙ্গ আসবে না, অসম্ভব । সৌরভ দাস মাধবীর সঙ্গে অভিনয় করলেন 'আমি কোন পথে যে চলি'তে, শাশ্বত হাত পা নাড়লেন সাবিত্রীর সঙ্গে 'এবার মলে সুতো হব'তে । দুটোই দুর্দান্ত গান, দুটো ছবিই বার বার দেখার মতো, এবং দুটোরই নায়ক উত্তমকুমার ।
এই পর্যন্ত লিখে একটু পজ নিতে হচ্ছে । প্রথম ছবিতে অবশ্যই 'নায়ক' উত্তম, দ্বিতীয়টিতে? তখন তিনি রোম্যান্টিক নায়ক সাজবার বয়স প্রায় পার করে ফেলেছেন (জীবনের শেষে হিন্দিধর্মী 'আনন্দ আশ্রম'/ 'অমানুষ' বাদ দিলে ), চেহারা ভারী হয়েছে, ধীরে ধীরে ঝুঁকছেন চরিত্রাভিনয়ের দিকে। এবং নায়কের দাদার চরিত্রেও পর্দা আলো করে থাকছেন । (দুর্ভাগ্য তাঁর, দুর্ভাগ্য বাংলা ছবিরও, যখন তিনি চরিত্রাভিনেতা হওয়ার কাজটা শুরু করেছিলেন, তখনই তাঁকে চলে যেতে হল । অবশ্য বেঁচে থাকলে আশি ও নব্বইয়ের দশকে অখাদ্য বাংলা ছবিতে নায়কের অথর্ব বাবার ভূমিকায় তাঁকে বারবার দেখতে হত আমাদের । হয়নি, তাই না তাঁকে আমরা মনে রেখেছি বাংলা ছবির সর্বকালের সেরা ম্যাটিনি আইডল বলে?)
'মৌচাক'-এ মিঠু মুখার্জি রঞ্জিত মল্লিককে বলছেন, তোমার দাদা তোমার চেয়ে অনেক বেশি স্মার্ট । এর চেয়ে সত্যবচন আর হয় না বোধ হয় । মৌচাক এবং ধন্যি মেয়ে, দুটো ছবির ক্ষেত্রেই একথা সত্যি । সুপুরুষ রঞ্জিত, আবেদনময়ী মিঠু, খরখরে জয়া - সকলকে হারিয়ে দিয়েছে উত্তম-সাবিত্রী জুটির রসায়ন। নিঃসন্তান কিন্তু পোড়খাওয়া দম্পতি, বিবাহযোগ্য দেওরের প্রতি প্রায় পুত্রস্নেহ।
গানে ফিরি । 'এবার মলে সুতো হব'র লিরিক গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের, সুর নচিকেতা ঘোষের, গেয়েছেন মান্না দে । সেদিক থেকে দেখতে গেলে এ গানের ভালো না হওয়ার কোনো জায়গাই নেই । কিন্তু আরেকটি কারণে এই গানটা মনে রাখা দরকার বলে আমি মনে করি । বাংলা ছবিতে তো বটেই, হিন্দি ছবিতেও দীর্ঘদিন বিবাহিত মাঝবয়সী স্বামী-স্ত্রীর এজাতীয় নিঃশব্দে-ইরোটিক গান প্রায় নেই বললেই চলে । গানের শুরুতে কিঞ্চিৎ অসংবৃতবসনা সাবিত্র্রীকে দেখে চোখ মটকে উত্তম বলছেন, মাইরি বলছি, লোভ সামলাতে পারছি না । স্ত্রীর প্রতি মধ্যবয়সী স্বামীর এমন কামনাজরজর উচ্চারণ বাংলা ছবিতে এর আগে-পরে দেখেছি বলে মনে করতে পারি না।
'আমার দিন কাটে না', 'কে প্রথম কাছে এসেছি', 'নীড় ছোট ক্ষতি নেই' - বিবাহোত্তর প্রেমের কালজয়ী গান বাংলায় কম নয় । কিন্তু এ জিনিস সে জিনিস নয় । 'নীড় ছোট'তে নায়ক গাইছেন,
মেঘ রোদ সব বাধা পার হয়ে যাও।
তব ঐ দুটি ভীরু চোখে
ভুবনেরে নাও ভরে নাও ।
তাই দিয়ে আপনারে সুন্দর করো৷
(প্রসঙ্গতঃ, এই গানও গৌরীপ্রসন্ন -নচিকেতারই )
আর 'এবার মলে' তে শুনছি
এবার মলে সুতো হব
তাঁতির ঘরে জন্ম লব
পাছাপেড়ে শাড়ি হয়ে দুলব তোমার কোমরে
তোমরা যে যা বলো আমারে ।
হিন্দিতে 'কতরা কতরা মিলতি হ্যায়', 'ফির ওহী রাত হ্যায়' আছে বটে, কিন্তু সেগুলো কোনোটাই এরকম mature প্রেমের গান নয় । এ গানের তুলনা কিছুটা ' তেরে বিনা জিন্দগী সে কোই শিকওয়া তো নহী ' । গুলজারের কথায়, আর ডির সুরে, লতা-কিশোরের কণ্ঠে দুই প্রৌঢ় প্রেমিক-প্রেমিকা গাইছেন,
জি মে আতা হ্যায়, তেরে দামন মে, সর ছুপাকে হম
রোতে রহে, রোতে রহে
তেরি ভি আঁখো মে আঁসুয়ো কি নমি তো নহী......
Khub sundor...
ReplyDelete