কাল কী খাব জানি না রে। শ্রীমতী ওয়াং বললেন তার বড় ছেলেকে ।
ওয়াং বিধবা, অবস্থা মোটেই ভালো নয়। হাতে তেমন পয়সাকড়ি নেই, ছেলে মিং লি একটা দোকানে ছোটোখাটো চাকরি করে, দিনের হিসেবে মাইনে পায় । এদিকে গত শীতে প্রচণ্ড বরফ পড়ে ছাদের একটা অংশ ধসে গিয়েছিল, হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়েছিল দেওয়াল । বিপদের উপর বিপদ, মিং লি সারারাত জেগে ঠান্ডা লাগিয়ে নিমোনিয়া বাধিয়ে বসেছিল । বহুদিন বিছানায় পড়েছিল, ওষুধবিষুধডাক্তারে টাকাপয়সা খরচ হয়েছিল জলের মতো । শেষ হয়ে গিয়েছিল যৎসামান্য সঞ্চয়, অনেক দিন কাজে যেতে না পারায় চাকরিটা গিয়েছিল মিং লি-র । যে দোকানে সে কাজ করত, সেরে উঠে সেখানে গিয়ে সে দেখেছিল, সেখানে অন্য লোক রাখা হয়েছে। এদিকে অসুখ থেকে উঠে হাতে পায়ে জোর পায় না, মাথা টলমল করে, এক হাত মাটি কাটতে গেলে দশবার হাঁপায়, কাঠ কাটতে গেলে আধ ঘণ্টার কাজে দু ঘন্টা লাগায়, আশেপাশের গাঁয়েও কেউ তাকে কাজ দিল না। বেচারা রোজই কাজের খোঁজে বেরোয়, আর সন্ধেয় মুখ চুন করে বাড়ি ফিরে আসে । মুখে মা-কে বলে বটে 'সব ঠিক হয়ে যাবে' কিন্তু ভেতরে ভেতরে মায়ের ছেঁড়া কাপড় আর শুকনো চেহারা দেখে বড্ড কষ্ট পায় ।
ভগবান কিছু একটা ঠিকই জুটিয়ে দেবেন, মা। খুঁজেপেতে কোথাও কি আর কিছু টাকাকড়ি পাব না? মিং লি হেসে বলল বটে, কিন্তু কোন দিক দিয়ে কী সুরাহা হবে সে কিছুই ভেবে পাচ্ছিল না ।
ছেলে বেরিয়ে গেলে ওয়াং রান্নাঘরে খুটুর খাটুর করতে থাকেন । কোথাও যদি মেলে একটু ময়দা,এক টুকরো আলু, বাসনকোসন কৌটোবাটা ঝেড়ে যদি বেরোয় একমুঠো চাল ।
আহা, বাছা আমার সারাদিন খাটে, কীই বা তুলে দেব ওর মুখে, মনে মনে বলেন তিনি। আধপেটা খেয়ে কত দিন কেটে গেল, এবার কি ঈশ্বর দয়া করবেন না? আহা, না খেয়ে ফুটফুটি আর কেলটুশও হাড্ডিসার হয়ে গেল গো !
ঘরের এক কোণে জড়াজড়ি করে পড়ে ছিল বেড়াল ফুটফুটি আর কুকুর কেলটুশ। সব শুনে মিহিগলায় তারা সাড়া দিল, মিঁউ মিঁউ । ভৌ ভৌ । খেতে না পেয়ে পেয়ে বেচারারা রোগা কাঠি হয়ে গেছে, উঠে খাবার খুঁজতে যাওয়ার শক্তিটুকুও নেই ।
হঠাৎ দরজার কড়াটা খটাখট শব্দে নড়ে উঠল । দরজা খুলে ওয়াং দেখেন টাকমাথা এক বুড়ো সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে। ইনি আবার কিনি? সাধুসন্নিসিকে সিধে দেওয়ার নিয়ম, ইনি সেরকম কিছু চেয়ে বসলেই চিত্তির ।
কিছুই যে নেই আমাদের, বাবা, হাত জোড় করে তড়বড় করে বলেন ওয়াং, আমরা গত দু হপ্তা কী খেয়ে বেঁচে আছি শুধু আমরাই জানি । কুড়িয়ে কাচিয়ে যা পাওয়া যায় তাই দিয়ে পেট চালিয়েছি। আজ মিং লি-র বাবা থাকলে আমাদের এমন দুর্দশা হত না । ওই যে বেড়ালটা, এত মুটিয়েছিল যে ছাদে অবদি চড়তে পারত না, এখন দেখুন তার অবস্থা, পাঁজরা গোনা যায় । আমাদের মাপ করবেন বাবা, আমরা বড়ো দুঃখী ।
সন্ন্যাসী হেসে ফেলেন । আমি ভিক্ষে নিতে আসিনি রে, বেটি । ঈশ্বর তোর প্রার্থনা শুনেছেন, তোর কষ্ট দেখেছেন । তোর ছেলেটি বড় ভালো, এত কষ্টেও তোকে আগলে রেখেছে যতদূর সম্ভব। ওর হাতে কাজ নেই, তোদের পেটে খাবার নেই, সব জেনেই আমি এসেছি রে ।
ওয়াং হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন । সন্নিসিঠাকুর এত জানলেন কী করে ?
সন্ন্যাসী কাঁধের ঝোলা থেকে একটা জিনিস বের করে ওয়াংয়ের হাতে দেন। এই নে, এটা ধর।
ওয়াং হাতে নিয়ে দেখেন, একটা সোনালী গুবরে পোকা, চোখের জায়গায় লাল মীনে করা । দিব্যি দেখতে, বেশ ভারী জিনিস । এটা বেচলে বেশ কদিনের বাজরা (millet) জোগাড় হয়ে যাবে ।
খবরদার! এটা বেচবার কথা চিন্তাও করবি না । সাধুবাবার গমগমে গলা শোনা গেল এবার। এই গুবরে পোকায় জাদু করা আছে। যতদিন এটা তোর কাছে থাকবে, খাবারদাবারের কোনো অসুবিধা হবে না । খাবার সময় হলে এই পোকাটা একহাঁড়ি ফুটন্ত জলে ফেলে চাপা দিয়ে দিবি, আর যা খেতে ইচ্ছে তার নাম জোরে জোরে আওড়াবি । মিনিট তিনেক পরে ঢাকনা খুলবি, দেখবি তোর পছন্দের খাবার হাজির । তার সোয়াদগন্ধ তোর ধারণারও বাইরে ।
ওয়াং হাঁ করে শুনছিলেন, বললেন, এবার তাহলে পরখ করে দেখি, বাবা?
বাবা হাসলেন । তর সইছে না রে, বেটি ? আমি চলে যাই, তারপর চেষ্টা করে দেখিস ।
সন্ন্যাসী চলে গেলে দোরটুকু বন্ধ করতে যা দেরি, ওয়াং লাফিয়ে পড়ে আগুন জ্বালালেন , একহাঁড়ি জল ফুটতে দিয়ে তার মধ্যে গুবরেটাকে ছেড়ে দিলেন ।
আর ঘুরে ঘুরে বিড়বিড় করতে লাগল,
ভাপা পিঠে ভাপা পিঠে, বড়োই জ্বালা পেটে
ভাপা পিঠে আয় রে আমার হাঁড়ির ভিতর হেঁটে
আয় আয় ভাপা পিঠে, খিদেতে প্রাণ যায়
আয় আয় ভাপা পিঠে, গরম গরম খাই ।
সন্ন্যাসী যদি সত্যি না বলে থাকেন? যদি সবটাই ধাপ্পাবাজি হয়ে থাকে? উঃ, তিন মিনিট কী লম্বা !
ঘড়ি ধরে ঠিক তিন মিনিট পর হাঁড়ির ভিতর থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করল, তারপর পটাং করে খুলে গেল ঢাকনাটা । ঘর ভরে গেল খাবারের গন্ধে ।
ওয়াংয়ের চোখ বড় বড়, মুখ হাঁ । হাঁড়ির মধ্যে থরে থরে সাজানো নরম, তুলতুলে, পুরুষ্টু ভাপা পিঠে ।
ওয়াং দুহাত ডুবিয়ে পিঠে খেতে লাগলেন । গরমে মুখ পুড়ে যায়, ধোঁয়ায় মুখে ছ্যাঁকা লাগে, ওয়াং খেতেই থাকেন, খেতেই থাকেন । কী তার সোয়াদ, কী গন্ধ ! খেয়ে এত সুখ তা কে জানত! ওয়াং খেতে থাকেন যতক্ষণ না পেট আইঢাই করে ওঠে । কুকুর আর বেড়ালটাকেও খাওয়ান ঠেসে ঠেসে।
ভগবান তাহলে মুখ তুলে চাইলেন, কী বল? কেলটুশ ফুটফুটিকে বলল । দুটোতেই খেয়ে দেয়ে পেট ঢাপ্পুস করে বারান্দায় রোদে শুয়ে ছিল। কী কষ্ট গেছে, বাপ রে ! আর কয়েকদিন এরকম চললে পালিয়েই যেতাম বোধ হয় ।
এদিকে ওয়াং ভাবছিলেন কখন ছেলেকে সুখবরটা দেবেন । আহা বাছা কতদিন পেট ভরে খেতে পায় নি, আজ সামনে বসিয়ে ওকে আদর করে খাওয়াব ।
মিং লি ফিরল মুখখানা কালো করে । আজও কাজ জোটেনি তার । বেচারা ভাবতে ভাবতে আসছিল রাতে মায়েপোয়ে কী খাবে, বা আদৌ কিছু খাবে কি না, কিন্তু দরজা খুলে মায়ের মুখে হাসি দেখে বেচারা হকচকিয়ে গেল ।
আয়, আয়। আহারে, বাছার আমার মুখখানা শুকিয়ে গেছে । ওরে, এতদিনে ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন, আর আমাদের খাবার কষ্ট থাকবে না। হাঁড়িতে ফুটন্ত জল, তাতে সোনালি কী একটা ফেলে দিল মা । দেখে মিং লি-র আক্কেল গুড়ুম । অভাবের চোটে, খিদের জ্বালায় মায়ের মাথাটাই কি গেল তবে ? আর কিছুই তো নেই, গায়ের এই শার্টখানা বেচে যদি -
কেলটুশ হাত চাটছিল লি-র । আরে ঘাবড়াও মৎ, সব ঠিক হো গিয়া । ফুটফুটে গুরগুরগুর শব্দ করছিল গলায়, লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল চেয়ার থেকে মোড়ায় ।
মিং লি-র বোধবুদ্ধি কাজ করছিল না, তার মধ্যেই সে শুনল মা বলছেন -
শিগগির শিগগির খেতে বসে পড়, বাবা, মাংসের পিঠেগুলো ঠান্ডা হয়ে যাবে যে !
মিং লি নিজের কাঁকে বিশ্বাস করতে পারছিল না । মাংস? পিঠে? এসব কী? শেষ কবে এসব খেয়েছিল সে? ততক্ষণে অবশ্য তার চোখ চলে গেছে টেবিলের দিকে । সেখানে থরে থরে সাজানো শুয়োরের মাংসের পিঠে, ধোঁয়া উঠছে সেখান থেকে ।
আগে খেয়ে নে, বাবা । ছেলেকে বললেন ওয়াং । পেট ভরে খেয়ে নে, তারপর সব বলব ।
মিং লি-কে আলাদা করে বলার কিছু ছিল না অবশ্য । সে ততক্ষণে ঝাঁপিয়ে পড়েছে খাবারের ওপর, হুসহাস করে গিলছে সুস্বাদু পিঠে। মাংসের স্বাদ মিলিয়ে যাচ্ছে জিভে, একের পর এক গরম পিঠের টুকরো নেমে যাচ্ছে গলা বেয়ে ।
ওয়াং একদৃষ্টে চেয়ে ছিলেন ছেলের দিকে । আহা, বেচারা কতদিন পেট ভরে খায়নি। খাক খাক, তারপর তিনি ওকে সব বলবেন ।
মিং লি-র খাওয়া শেষ হওয়া অবধি অবশ্য তাঁর তর সইল না । অনেকটা খাবার মুখে নিয়ে ছেলে যখন একটু দম নিচ্ছে, তখন হাতে গুবরেটাকে এনে তিনি ছেলের সামনে ধরলেন ।
মিং লি-র চোখ বড় বড় হয়ে গেল । ও বাবা, সোনা না কি ? কোন দেবদূত এসে দিয়ে গেল এটা, মা?
ওয়াংয়ের কথা ফুরোচ্ছিল না । সে দেবদূতই বটে বাবা, কিন্তু দেখতে সন্নিসিঠাকুরের মতো। উনি এইটে দিয়ে গেছেন আমাদের ।
মিং লি-র মাথায় কিচ্ছু ঢুকছিল না । এই পোকাটার সঙ্গে এসব খাবারের সম্পর্ক কী?
ওদিকে ওয়াং গড়গড় করে বলে যাচ্ছিলেন গুবরেটার বৃত্তান্ত। কীভাবে ওটাকে জলে সেদ্ধ করা হল, কীভাবে হাঁড়িভর্তি পিঠে পাওয়া গেল - সব। মিং লি-র খাওয়া ততক্ষণে শেষ হয়ে গিয়েছিল, বাকি পিঠেগুলো তিনি নামিয়ে দিলেন কেলটুশ আর ফুটফুটির সামনে । মিং লি হাঁ করে তাকিয়ে রইল । সমস্ত বেঁচে যাওয়া খাবার যত্ন করে তুলে রাখা হবে, এরকমটাই সে দেখে এসেছে এতকাল । খাবার ফেলাছড়া করে নষ্ট করার সুযোগ তাদের কোনোদিনই হয়ইনি ।
এর পরে কদিন কী আনন্দ, কী আনন্দ । মা, ছেলে, কুকুর, বেড়াল - কারোরই কোনো অভাব নেই, খাওয়ার কষ্ট নেই - যখন যা চায় তাই পায় - দিনে দিনে মিং লি-র গায়ে গত্তি লাগল, চেহারায় চেকনাই এল, কাজে যাওয়ার দরকার পড়ল না আর । বসে বসে সে কুঁড়ে হয়ে যেতে লাগল, কুকুর আর বেড়ালটা বসে বসে খেয়ে মোটা হয়ে গেল, চকচকে হয়ে গেল তাদের চামড়া ।
এই অবধি হলে কোনো অসুবিধে ছিল না , কিন্তু এবার মা-ছেলের বুদ্ধি বিগড়োলো । নিজেদের সুখ কি অন্যকে না চোখে আঙ্গুল দিয়ে না দেখালে আরাম হয়? ভালো লাগে বন্ধুবান্ধবকে নেমন্তন্ন করে ধনদৌলত না দেখালে? ওয়াংরাও নেমন্তন্ন করতে লাগল আত্মীয়স্বজন, চেনাপরিচিতদের, আর দারুণ সব খাবার খাইয়ে তাক লাগিয়ে দিতে লাগল তাদের ।
একদিন এলেন শ্রী ও শ্রীমতী চু । এঁরা খানিক দূরে থাকেন, তাই আগে আসতে পারেন নি । ওয়াংরা অনেক দিন থেকেই ডাকাডাকি করছিলেন, এঁরা আজ কাল করে এড়িয়ে যেতেন । মনে ভাবতেন এসে আর কী হবে, খাওয়াবে তো শুকনো রুটি আর একটা ঘ্যাঁট, যাওয়া আসার পরিশ্রমই সার ।
কিন্তু এসে তাঁদের চক্ষু চড়কগাছ ! কোথায় শুকনো রুটি, কোথায় অখাদ্য ঘ্যাঁট? টেবিলভর্তি সুস্বাদু গরম খাবারদাবার। কী তার চেহারা, কী তার খোশবাই ! আর পরিমাণে এত যে, চারজন মিলে গাণ্ডেপিণ্ডে গিলেও শেষ করা গেল না ।
ওঃ কী খেলাম, কী খেলাম ! কোত্থেকে এসব জোগাড় করল কে জানে। মিস্টার চু বাড়ির তালা খুলতে খুলতে বললেন। ওয়াংদের বাড়ি থেকে ফিরে এসে তাঁর চোখে পড়ছিল, বাড়ির দেওয়ালে শ্যাওলা ধরেছে, সামনের বাগানটা আগাছা ভর্তি, জানালার পর্দাগুলো কাচা হয়নি কতকাল।
জানবে আর কী করে, কোনো দিকে কি হুঁশ থাকে তোমার ! আমি জানি খাবারটা কোত্থেকে এসেছে । বললেন শ্রীমতী চু। ওয়াং বুড়ি হাঁড়ি থেকে একটা কী যেন মাদুলি না গয়না কী যেন বের করে রান্নাঘরের একটা তাকে গুঁজে রাখল দেখলাম । কিছু একটা তুকতাক করছিল নির্ঘাত, শুনলাম বিড়বিড় করে খাবারের নাম বলছে । তাঁর স্বামীর মতো অতখানি আলাভোলা হলে তাঁর চলে না, চোখকান খোলা রাখতে হয় ।
তুকতাক? তাই হবে তাহলে । আমাদেরও যেমন কপাল, এসব জোটে না। সারাজীবন অন্যের দিকে তাকিয়েই দিন যায় । শ্রী ওয়াং দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
আচ্ছা, ওয়াংদের ওই মাদুলিটা একটু নিয়ে আসা যায় না? ক’দিন পেট ভরে খেয়ে নিতুম? চাইলে দেবে না, না ? ফেরত তো দিতেই হবে, দিয়েও দেব, শুধু ওই কটা দিন মাত্র -
অমনিই কী আর দেবে? দামী জিনিস, কাজের জিনিস, অষ্টপ্রহর চোখে চোখেই রাখে নির্ঘাত। আনবই বা কীভাবে? বাড়ি ফাঁকা হবে, তবে না? থাকে তো একটা ঘরে, ছেলেটাকেও কাজে যেতে হয় না আজকাল। জিনিসটা আনব কীভাবে? উঃ বাপরে, গরিবের ঘর থেকে জিনিস আনাও ঝকমারি । হত রাজারাজড়ার ঘর, টুক করে উঠিয়ে আনতাম, কেউ খেয়ালই করত না ।
শ্রীমতী চু-র হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে যায় । আরে, সেদিন ওয়াং বুড়ি ছেলেকে কী একটা মেলায় যাবার কথা বলছিল না? মনে পড়েছে, বড় মন্দিরের সামনের মেলা। কখন নিয়ে যাবার কথা বলছিল বুড়ি? দুপুর দুপুরই না? ঠিক ঠিক। তাহলে তো তখন বাড়ি ফাঁকা থাকবে অনেকক্ষণ। তখনই তো কাজটা সেরে ফেলা যায় ।
যেই না ভাবা, অমনি গিয়ে মিস্টার ওয়াংকে ধরলেন তিনি । বেচারা ভদ্রলোক আরাম করে একটু গড়াচ্ছিলেন, শুনেটুনে আঁতকে উঠলেন ।
আরে পাগল নাকি ! ওই কেলে কুকুরটা আছে না? বাড়িতে ঢুকবে কেমন করে?
আরে দূর দূর, কেলটুশ আবার একটা মানুষ নাকি ! ও ব্যাটা তো মোটা হাতি হয়ে গেছে, নড়তেই পারে না, কেবল এ-পাশ ও-পাশ গড়ায়, ওটাকে আবার ভয় কীসের? আর যদি ওরা আচমকা এসেই পড়ে, বলব আমার খোঁপার কাঁটাটা হারিয়ে গেছিল, খুঁজতে এসেছি । মিটে গেল!
চু খুশি হতে পারছিলেন না। আচ্ছা যাচ্ছ যাও, কিন্তু মনে রেখো, আমরা কিন্তু জিনিসটা ধার নিচ্ছি, আবার ফেরত দেব, কেমন? ওরা আমাদের আদর করে খাইয়েছে, বন্ধুলোক, আমরা ওদের জিনিস চুরি করছি না কিন্তু, মনে থাকবে?
আর মনে থাকবে ! শ্রীমতী চু হন হন করে হেঁটে ওয়াংদের বাড়ি পৌঁছালেন, তারপর একছুটে জিনিস নিয়ে বাড়ি । এমন নিঃসাড়ে চুপিসাড়ে কাজটা হল যে কাকপক্ষীতেও টের পেল না । কুকুরটা অচেনা লোক দেখে টুঁ শব্দটিও করল না, বেড়ালটা চোখ পিটপিট করে পাশ ফিরে শুল ।
এদিকে মেলা থেকে ফিরে ওয়াং আর মিং লি-র মাথায় বাজ পড়ার দশা । ঘুরে ঘুরে দুজনেরই পায়ে ব্যথা, ভেবেছিল ফিরে এসে রাতের খাবার গরম গরম খাবে। কিন্তু কোথায় কী! সাত রাজার ধন মানিক গায়েব, আলমারির খোপ ফাঁকা । সারাবাড়ি হাঁটকেও জিনিসটা পাওয়া গেল না। খুঁজেপেতে ক্লান্ত হয়ে মা-ছেলে যখন রণে ভঙ্গ দিল, তখন ঘরদোরের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল একটা ঝড় বয়ে গেছে ।
সেদিন রাতে ঢকঢক জল খেয়ে খিদে চেপে শুয়ে রইল দুজন । কিন্তু তার পরে সকাল আছে, দুপুর আছে, রাত আছে । আছে আরও অনেক অনেক দিন। মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকলে পেট তো কথা শুনবে না। তাই উঠতেও হয়, আর কুড়িয়েবাড়িয়ে খুদকুঁড়োর ব্যবস্থাও করতে হয়।
উঃ, খিদে কি ভয়ানক ! খাবার জোগাড় করা কি কঠিন ! সুখের কয়েক মাসে মা-ছেলে খাবারের কষ্ট প্রায় ভুলেই গিয়েছিল, এখন সে কষ্ট যেন দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এল । যে সব ভালো ভালো খাবার ফেলেছড়িয়ে খেয়েছে তারা গত কয়েক মাসে, এখন তার কল্পনাও অসম্ভব । এখন দুবেলা দুটি জুটলেই যথেষ্ট ।
কেলটুশ আর ফুটফুটির অবস্থাও কাহিল । এ ক’মাসে খেয়ে দেয়ে মোটা হয়েছে বিলক্ষণ, খাবার ঢুঁড়ে নেওয়ার অভ্যেসও গেছে চলে । বেচারারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় আর এখানে এক মুঠো ভাত, ওখানে একখানা হাড় - অন্য কুকুরেরা যা ছুঁয়েও দেখে না, যা পায় তাই খায় । দেখতে দেখতে দুটোরই হাড্ডিসার চেহারা, গায়ের লোমে চিট ময়লা, মেজাজ সর্বদাই খেঁকুটে। আগে দুজনে দুজনকে চোখে হারাত, এখন কাছাকাছি গেলেই ঘ্যাঁক ।
হ্যাঁরে তুই এত খিটপিট করিস কেন আজকাল? পাগল হলি নাকি? কেল্টুস বলেই ফেলল ফুটফুটিকে । ফুটফুটি সকাল থেকে দুবার ফ্যাঁস ফ্যাঁস করে তেড়ে গেছে তার দিকে ।
পাগল হব কেনরে কেলেমানিক, আমি কি তোর মতো মাথামোটা? আমি ভাবছি আমাদের এই অবস্থা হল কেমন করে । মনে হচ্ছে ভেবে পেয়েছি, বুঝলি?
এঁএঁহ, উনি সব বুঝে গেছেন, বুদ্ধির ঢেঁকি কোথাকার! ইঁদুরের লেজ গুনেই তো দিন যায়, কেলটুশ ফুট কাটে৷
এই ব্যাটা কেলেকুষ্টি, বুঝে কথা বল, ফুটফুটিও রোঁয়া ফোলায়৷ তোর ভবিষ্যৎ আমার এই — এই থাবার মধ্যে, তা জানিস? আমি সব আগের মতো করে দেব, তুই শুধু বল আমায় সাহায্য করবি কি না৷
করবই তো, করবই তো, আহ্লাদে লাফালাফি করতে থাকে আর পটাপট ল্যাজ নাড়ে কেলটুশ, কী করলে আবার পেটপুরে খেতে পাব বল, তাই করব৷ এই দ্যাখ তোর সঙ্গে থাবা মেলালাম৷
ফুটফুটি এবার গুছিয়ে বসে৷ দ্যাখ, ওয়াংমায়ের সোনার গুবরেটা চুরি হয়েছে তো বোঝাই যাচ্ছে৷ মনে আছে তোর, বড় হাঁড়িটা থেকে কেমন রকম—বেরকমের খাবার বেরোত? খেয়াল করেছিলি, রোজ ওয়াং —মা আলমারির খোপ থেকে গুবরেটাকে বের করে হাঁড়ির মধ্যে দিত? একদিন আমার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে নিজের মনে বলেওছিল, বুঝলি ফুটফুটি, এই জিনিসটি যে—সে নয়৷ এ হতেই আমাদের সব সৌভাগ্য৷ তারপর আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখেছিল জিনিসটা৷
কেলটুশের চোখ গোল গোল, কান খাড়া হয়ে ওঠে৷
আরে, তুই এসব আগে বলিসনি কেন?
বুঝলে তো বলব রে বাপু৷ সেদিন ওই চু না মু কারা যেন এসেছিল মনে আছে? আমরা অনেক মাংসটাংস খেলুম? ফিরে যাওয়ার পরে ওই মেয়ে চু আবার এসেছিল, মনে পড়ছে? ওয়াং—মা আর মিংদাদা তখন মেলায় গিয়েছিল৷ আমি দেখেছিলাম, চু ওই খোপ থেকে কী একটা জিনিস বের করে নিচ্ছে৷ তখন বুঝিনি৷ এখন বুঝছি, ওই হাপিস করেছে জিনিসটা৷ আর এখন মিঞাবিবি মিলে আমাদের খাবারগুলো সাবাড় করছে৷
কী! চল ওদের দুটোকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে রেখে আসি, কেলটুশ দাঁতে দাঁত ঘষে৷
এই চোওপ! এসব কী কথা! ফুটফুটি এক ধমক দেয়৷ আমরা জিনিসটা ফেরত নেব, মিটে গেল৷ শুধুশুধু মারধোর, রক্তারক্তি — ওসব মানুষের কাজ, আমরা করি না, বুঝলি?
তাহলে কী করা যায় ? বুদ্ধি দে একটা৷ কেলটুশ মাথা চুলকোয়৷
চঃ, চু—দের বাড়ি গিয়ে গুবরেটা নিয়ে পালিয়ে আসি৷ ফুটফুটির কর্মপদ্ধতি খুব সংক্ষিপ্ত৷
দ্যুৎ, আমি গিয়ে তো কোনো লাভই হবে না। কেলটুশ দুঃখী মুখ করে বলে, ওরা নিশ্চয় দরজা-জানালা এঁটেসেঁটে বন্ধ করে রেখেছে । তুই যেমন তরতর করে বাড়ির ছাদে উঠে যাবি, আমি তো তা পারবই না । কিছু কিছু জিনিসে বেড়ালদের সুবিধে দেখে হিংসে হয় সত্যি !
উফ, বোকাটা ! ফুটফুটি মাথা চাপড়ায়, আমি নাহয় দেওয়াল বেয়ে ঘরে ঢুকে জিনিসটা বের করে আনলাম, কিন্তু আমায় ওবাড়ি অবধি নিয়ে যাবে কে? মাঝে একটা নদী পড়বে, সে খেয়াল আছে? তুই সাঁতার দিবি, আমি তোর পিঠে চড়ে থাকব, বুঝলি । রাস্তায় ঘাটে জন্তুজানোয়ার তেড়ে এলে তুই সামলাবি, আর জিনিসটা নিয়ে বেরিয়ে এলে একদম তৈরী হয়ে থাকবি বাইরে, আমরা শিগগির শিগগির পালিয়ে আসব।
আর বলার যা অপেক্ষা, দুজনে মিলে রাতেই বেরিয়ে পড়ল । অনায়াসে নদী সাঁতরে পার হয়ে গেল কেলটুশ| আঃ, কী ঠান্ডা জলটা!
মনে হচ্ছে সেই ছোট্টবেলায় ফিরে গেছি রে, হাতপা ছুঁড়তে ছুঁড়তে বলল কেলটুশ । পিঠে বসে থাকা ফুটফুটি মাথা নাড়ল । চারদিকে কালো জল, মাথার ওপর এই এত্তবড় গোল চাঁদ, গোঁফের ওপর মিঠে হাওয়া - তার খুব ভালো লাগছিল ।
দুই বন্ধু যখন চু-দের বাড়ি পৌঁছল, তখন ঢং ঢং করে বারোটা বাজছে । বাড়ি অন্ধকার, সবাই গভীর ঘুমে ।
চুপটি করে এইখানে দাঁড়িয়ে থাক, কেল্টুশের কানে কানে বলে ফুটফুটি লাফিয়ে উঠল পাঁচিলে, সেখান থেকে আর এক লাফে বাগানে । একটা ঝোপের ছায়ায় বসে ভাবছে এবার কোন দিক দিয়ে ঢুকলে সুবিধে হবে, এমন সময়ে -
কোথায় একটা খসখস আওয়াজ না? কান খাড়া হয়ে গেল ফুটফুটির । এক মুহূর্ত, তার পরেই অন্ধকারের মধ্যে নির্ভুল থাবা চালিয়ে একটা ইঁদুরকে পাকড়ে ফেলল সে ।
বেচারা আশপাশ ফাঁকা দেখে একটু হাওয়া খেতে গর্তের বাইরে বেরিয়েছিল ।
তবে রে হতভাগা, ইঁদুরটাকে ঝাঁকাচ্ছিল ফুটফুটি, নাম কী তোর?
ইঁদুরটার বয়েস কম, তাই সাহসটাও বেশি। ঘাবড়ে গিয়ে কেঁদেটেদে ফেলল না । বরং পরিষ্কার বেড়াল-ভাষাতেই বলল, আমার নাম রতন এজ্ঞে। কাছেপিঠেই থাকি । ইয়ে, বলছিলুম কি, আপনার থাবাটা যদি একটু সরাতেন। মাইরি বলছি, আমি পালাব না । এই তিন সত্যি করলুম ।
ফুটফুটির খিদে পেয়েছিল ভালোই, ইচ্ছেও করছিল এই হতভাগা ইঁদুরকে এক থাবড়ে শেষ করে পেটটা ভরিয়ে নেয়, কিন্তু ইঁদুরের মুখে বেড়ালের ভাষা শুনে রতনকে তার অতটা খারাপ লাগছিল না । কিন্তু সেটা জানতে দিলে পাছে হতভাগা মাথায় চড়ে বসে, এই ভেবে সে আরেকটা ঝাঁকুনি দিল ইঁদুরটাকে । দাঁত খিঁচিয়ে বলল, এঁএহ, ইঁদুরের আবার তিন সত্যি!
তা যা বলেচেন কত্তা, যা বলেচেন, জাতধম্ম বলে আমাদের তো আর কিচুই নেই। তবে কিনা, আমাদের ফেমিলি হল গে' কনফুসি বাবার বাড়ির ইঁদুরের বংশ, ও বাড়ির ইঁট-কাঠে জ্ঞান টুসটুস কচ্চে, তাতেই কিচু কিচু পেয়েচি। ওই যাকে বলে উত্তর-উত্তরাধি - যাকগে, অত খটোমটো মনে থাকেনাকো । মানে এই যে আপনি আমায় ছেড়ে দিলেন - বলে কী সব কসরত করে সে ফুটফুটির থাবার তলা থেকে সুরুৎ করে বেরিয়ে পড়ল - তাতেও কি আমি পালাব? মোটেই নয়কো । বরং এই যে আপনি আমার উবগারটা কল্লেন, তাতে আমি আপনার কেনা গোলাম হয়ে থাকব। বলে সে ভারি ভক্তিভরে দু'হাত জোড় করে ফুটফুটির সামনে বসল ।
পালিয়ে দেখ না তুই! রোঁয়া ফোলাল ফুটফুটি । তার জিভ সুলসুল করছিল, কিন্তু সামলে নিল । এ ব্যাটাকে যদি কাজে লাগানো যায়, মন্দ কী?
অনেক তো বড় বড় কথা বললে চাঁদু, এবার ক'টা প্রশ্নের ঠিকঠাক জবাব দে দেখি । কোনো চালাকি না, মনে থাকবে ? রতন বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ল ।
এ বাড়ির লোকেরা কী খায় রে? ভালোমন্দই খায় নিশ্চয়ই, নইলে তোর এরকম নাদুসনুদুস মূর্তি হয় কী করে? আমার মতো রোগাপটকা নোস কেন তুই?
রতন হেঁ হেঁ করে বলে, তা যদি বলেন কত্তা, আপনাদের আশীব্বাদে কদিন একটু ভালোমন্দ খাচ্ছি বটে । এবাড়ির লোকেরা পিঠেটা, পরোটাটা মাংসটা একটু বেশি খাচ্ছে আজকাল, তাই কুড়িয়ে বাড়িয়ে আমাদেরও জুটে যাচ্ছে আর কি ।
পিঠে? মাংস? পরোটা? বটে ! ফুটফুটি খেপে আগুন হয়ে যাচ্ছিল। তা বাড়ির তো এই হাল, এত খাবারের পয়সা আসে কোত্থেকে শুনি ?
তা আর বলব কী কত্তা, রতন কাছে ঘেঁষে এসে ফিসফিস করে বলে - কোত্থেকে কিসব মাদুলি না কি পেয়েছে -
পেয়েছে না ছাই, ফুটফুটি এবার ফেটে পড়ে, চুরি! চুরি করে এনেছে , বুঝলি ? আমাদের বাড়ি গিয়ে গাণ্ডেপিণ্ডে গিলে, তারপর টুক করে হাতিয়ে এনেছে জিনিসটা । আর আমরা এখন না খেয়ে মরি । উঃ , যদি পেতাম না হাতের সামনে, দাঁতে দাঁত ঘষল সে, চোখদুটো খুবলে নিতাম একেবারে !
ও বাবা, বুঝিচি, বুঝিচি! তাই ভাবি ওই সোনালী জিনিসটা এল কোত্থেকে ! জিজ্ঞেস তো আর করতে পারি না, তাই না কত্তা ?
জিজ্ঞেসের নিকুচি করেছে তোর, ফুটফুটি ল্যাজ আছড়ায়, কান পেতে শোন। ওই সোনার জিনিসটা আমাকে এনে দে, আমি তোকে একেবারে ছেড়ে দেব। কোথায় রাখে ওটা জানিস তো?
রতন বিগলিতভাব হাত কচলায়, আজ্ঞে কত্তা তা আর জানিনে, আপনাদের আশীব্বাদে আমাদের তো সব্বোত্তর গতি কিনা! রান্নাঘরের দেওয়ালে একটা ফাটামতো আছে, সেখানে গুঁজে রাখে দেখিচি।
ভেরি গুড, গা ঝাড়া দেয় ফুটফুটি, শিগগিরি যা । অনেক দূর ফিরতে হবে আমাদের ।
রতন যেন আরও নুয়ে পড়ে । ইয়ে অপরাধ নেবেন না, কিন্তু ওই দব্যটা চলে গেলে আমাদের যে আবার খুদকুঁড়ো খেয়ে বেঁচে থাকতে হবে কত্তা?
চোওপ! চুরির জিনিসে ফুটানি মেরে আবার বড় বড় কথা ! ফুটফুটি হুঙ্কার দিয়ে ওঠে। যা বলছি। যদি এখুনি জিনিসটা এনে না দিস, তো তোরই একদিন, কি তোর কনফুসি বাবারই একদিন । জলদি, ওয়ান, টু -
থ্রি বলার আগেই রতন চোঁ করে হাওয়া । মিনিট পাঁচেক পরে সে ফিরল হাঁপাতে হাঁপাতে, মুখে সোনালী গুবরে। কোনোমতে ফুটফুটিকে জিনিসটা ধরিয়েই সে আর দাঁড়াল না । বলা তো যায় না, বড়র পীরিতি বালির বাঁধ, কখন মন ঘুরে যায় ! কনফুসি বাবা আজ জোর বাঁচিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু ফাঁড়া যে বার বার কাটবেই এমন কোনো কথা আছে?
সোনালী গুবরেটাকে নিয়ে দুই বন্ধু যখন নদীর ধারে পৌঁছল তখন সবে ভোর হচ্ছে। চারিদিকে হালকা আলো, গাছে পাখি ডাকছে, ফুরফুর করে হাওয়া বইছে । রাত জেগে দুজনেরই চোখ জ্বালা করছে, কারুর শরীরই আর চলছে না । দুজনেই নদীর পাড়ে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিল । ফুটফুটি গুবরেটাকে ঘাসের ওপর রেখে দুপাশে দুই থাবা পেতে বসে ছিল, কেলটুশ চেয়ে দেখছিল এদিক ওদিক ।
দেরি হয়ে যাচ্ছে যে, যাবি না? ফুটফুটি শুধোয় ।
কেলটুশ গা ঝেড়ে ওঠে । নদীর দিকে যেতে যেতে বলে, শোন, জিনিসটা কিন্তু সাবধানে রাখবি, ভুলেও ফেলে দিস না যেন । ওপারে যাওয়া অব্দি মুখ একদম কষে বন্ধ রাখবি, মেয়েমানুষ তো, সেইজন্যই বলা, মুখ বন্ধ রাখা ধাতে নেই কিনা !
কচুপোড়া! ভুরু নাচিয়ে গুবরে মুখে ফুটফুটি লাফিয়ে ওঠে কেল্টুশের পিঠে ।
কিন্তু কপালে বিপদ থাকলে খন্ডাবে কে? কেলটুশ সাঁতরে ওপারে পৌঁছে গেছে প্রায়, এমন সময় -
একটা মাছ জল থেকে লাফিয়ে উঠল । একেবারে ফুটফুটির নাকের সামনেই । এই এক হাত লম্বা মাছখানা, রুপোলী আঁশে রোদ ঝলকাচ্ছে ।
ফুটফুটির পেটের ভেতর খিদেটা চাগাড় দিয়ে উঠল । সে ভুলে গেল কেল্টুশের বারণ, সে ভুলে গেল সাবধান হতে, দিল হাওয়ায় এক কামড়, আর মুখ থেকে গুবরেটা খসে পড়ল জলে, তলিয়ে গেল মুহূর্তে ।
কেলটুশ হায় হায় করে ওঠে । গেল, গেল, সব গেল । তীরে এসে তরী ডুবল গো! সব এই হতচ্ছাড়া লুভিষ্টি বেড়ালের জন্য । এটার মাথায় কিচ্ছু নেই, স্রেফ ষাঁড়ের গোবর ।
ব্যাস, লেগে গেল দুমাদ্দুম ঝগড়া । দুজনেই রোঁয়া ফুলিয়ে ফ্যাঁশ করে তেড়ে যায়, দাঁত খিঁচোয়, এ ওকে গালাগালি দেয় । আর কী কী সব গালাগাল, বাবা রে বাবা। গাধা, ছাগল, এমন কি কচ্ছপ, খরগোশও । পরিস্থিতি এমনই ঘোরালো হয়ে উঠল যে শেষে একটা ব্যাঙ ছুটে এল।
আরে থামো থামো। শেষে কি মারপিট করে মরেই যাবে নাকি ! কী হয়েছে কী ?
দুজনে মিলে ক্যালরব্যালর করে যা বলল, তার থেকে সবটা বুঝে নিয়ে ব্যাঙ লাফ দিল জলে । এক দমে জলের তলায় পৌঁছে উদ্ধার করে এনে দিল সোনালী গুবরে ।
হারানিধি ফিরে পেয়ে দুই বন্ধু ঝগড়াঝাঁটি ভুলে গেল, গুবরে নিয়ে নাচতে নাচতে চলল বাড়ি ।
বাড়ি পৌঁছে দেখে, দরজা জানালা সব বন্ধ, ভেতরে কে যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে । কেলটুশ কত ঘেউ ঘেউ করে ডাকল, কেউ দরজা খুললই না ।
ওয়াং-মা খুব কষ্টে আছে, ফিসফিস করে বলল ফুটফুটি। দেখি যাই ভেতরে, কী করা যায় ।
বাড়ির একটা খোলা জানালা ছিল, সেটা দিয়ে লাফিয়ে ভেতরে ঢুকল ফুটফুটি । কেলটুশ বেচারি অত উঁচুতে লাফাতে পারবে না, তাই দাঁড়িয়ে রইল বাইরে।
ভেতরে ঢুকে ফুটফুটি দেখে, মিং লি মড়ার মত বিছানায় শুয়ে, না খেয়ে খেয়ে শরীরে আর কিছু নেই । বুড়ি ওয়াং মেঝেয় বসে বুক চাপড়ে ইনিয়েবিনিয়ে কাঁদছেন । ফুটফুটি এক লাফ দিয়ে ওয়াংয়ের কোলে চড়ল । গুবরেটাকে ওয়াংয়ের কোলে ফেলে লুটোপুটি খেয়ে মুখ ঘষতে লাগল গায়ে। এই দেখো মা, তোমার জিনিস আমি ফিরিয়ে এনেছি ।
জিনিস ফিরে পেয়ে ওয়াংয়ের আনন্দ আর ধরে না । আদর করে বেড়ালটাকে বুকে চেপে ধরলেন, তারপর হাঁচোড়পাঁচোড় করে উঠলেন রান্না করতে । ছেলেকে টেনে তুললেন বিছানা থেকে ।
ওরে ওঠ ওঠ, আমাদের কপাল ফিরে গেছে, এবার আবার পেট ভরে খাব ।
উনুনে হাঁড়ি চড়তে দেরি হল না, খাবারও তৈরী হয়ে গেল চটপট । ওয়াং আর মিং লি পেট ভরে তো খেলই, ফুটফুটিও পেট ঠেসে ভালোমন্দ পেল । কিন্তু কেলটুশ বেচারি যে খিদে পেটে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, সে কথা কারুরই মনে রইল না । সে বেচারা খাবারের গন্ধ শোঁকে আর পায়চারি করে, আর অপেক্ষা করে কখন দরজা খুলে তাকে ঘরে ঢুকতে দেওয়া হবে । কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকাই সার, কেউ তাকে খেতে ডাকল না ।
অনেকক্ষণ পরে জানালা গলে বেরোল ফুটফুটি । কেল্টুশের সামনে এসে থপ থপ করে হাঁটতে হাঁটতে বলল, আঃ, কী ভালোই না খেলাম । ওয়াং মা ভালোবেসে কত খাইয়েছে, কী বলি ! আমায় নিয়ে কী করবে ঠিক করতে পারছিল না । তোর খিদে পেয়েছে, না রে? তা দেখ যদি রাস্তায় কোথাও হাড়টাড় পাস, এ বাড়িতে তো তোর আর অন্ন জুটবে না মনে হয় ।
কেল্টুশের মাথায় আগুন ধরে গেল । তবে রে, পিঠে নিয়ে এতদূর গেলাম এলাম, আর নিজে পেট ঠেসে খেয়ে আমাকে খেদিয়ে দিচ্ছে? দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা। এক লাফে ফুটফুটির গলা টিপে ধরে তাকে একেবারে শেষ করে ফেলল সে ।
কেলটুশ আর বাড়িতে ঢুকল না । রাস্তায় বেরিয়ে বাকি সব কুকুরকে একজোট করে বলল, বেড়ালরা অকৃতজ্ঞ, উপকারীকে মনে রাখে না । কোনো কুকুর যেন কোনোদিন কোনো বেড়ালকে বিশ্বাস না করে।
সেদিন থেকে কুকুর আর বেড়াল একে অন্যের শত্রু। সেদিন থেকে কেল্টুশদের সমস্ত বংশধর, সে চীনদেশেই হোক কি অন্য কোথাও, ফুটফুটিদের নাতিনাতনিদের একমনে ঘেন্না করে। সেই থেকে কুকুররা বেড়ালদের একদম দেখতে পারে না ।
No comments:
Post a Comment