মাধবীলতা
(কালবেলা/
সমরেশ মজুমদার) – বিপ্লবের আর এক নাম| অনিমেষ যখন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, অত্যাচারে
পঙ্গু হয়ে জেলে কোমর ঘষটে বেড়াচ্ছে, মাধবীলতা তখন তার আর অনিমেষের সন্তানকে জন্ম
দিচ্ছে, বড় করছে| একজন অবিবাহিত মেয়ের পক্ষে এটা আজও সহজ নয়, সত্তরের দশকে তো প্রায়
অসম্ভব| বিপ্লব মানে যে শুধু বন্দুক পিস্তল লাল সেলাম নয়, বরং সমাজটাকে ঘাড়ে ধরে
অন্যভাবে ভাবতে বাধ্য করা, আর ভাবাটা যে নিজের জীবন থেকেই শুরু করতে হয়, এটা এর
চেয়ে ভালো করে বলা যায় না| লড়াকু|
কিরণময়ী (চরিত্রহীন/ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়) –
সন্তানধারণের জন্য যা দরকার তা-ই নারীর রূপ, এই ভয়ানক সত্যি কথাটা প্রায়ান্ধকার
রান্নাঘরে লুচি বানাতে বানাতে যিনি অবলীলায় নিজের পছন্দের বিবাহিত পুরুষকে বলে
ফেলতে পারেন, তাঁর ধক আছে, মানতেই হবে| সেই পুরুষ তাঁকে যথেষ্ট পাত্তা না দিলে তার
যুবক ভাইকে বিছানায় আত্মসমর্পণ করতে একরকম বাধ্য করে যিনি প্রতিশোধ নেন, তাঁর সাহস
নিয়েও প্রশ্ন তোলা সাজে না| উপন্যাসের শেষে কিরণের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট না করে
লেখকের উপায় ছিল না| উন্মাদ রূপসীর প্রতি সমাজের সহানুভূতি থাকে, স্বাধীনচেতা বিধবার
জন্যে সে নির্মম, অন্ততঃ সেই সময়ে|
‘চোখের বালি’র বিনোদিনীকেও এই লিস্টে রাখা যেত, যদি
সে মহেন্দ্র কাছে এলে আরেকটু সাহস দেখাতে পারত| তবে বিনোদ আর কিরণ দুজনের
ক্ষেত্রেই একটা ব্যাপার কমন| দুজনেই রীতিমত লেখাপড়া শিখেছে, ফলে দুজনেই সমাজকে,
সিস্টেমকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছে( যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে ইত্যাদি
...)| মাচ এহেড অফ হার টাইমস|
প্রমীলা পাল (অদ্বিতীয়/ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়)
– শরদিন্দুর লেখায় মহিলা চরিত্ররা খুব একটা গ্লোরিফায়েড হন না, বলাই বাহুল্য| রট্টা
যশোধরা, বীরশ্রী যৌবনশ্রী ইতিউতি আছেন বটে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা পুরুষের
প্রেমিকা, স্ত্রী বা সহকারী হিসেবে বর্তমান, ইংরেজিতে যাকে বলে playing second
fiddle. মেয়েরা পুরুষকে সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছেন,
এমনটা প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে| প্রমীলা চোখে পড়ার মত ব্যতিক্রম| দিনে শান্তা,
রাতে তপন সেজে সে কাজ হাসিল করত| নেহাত বোকার মতন চিন্তামণিবাবুর দূরবীনের পাল্লার
মধ্যে খুনটা না করলে তার টিকিটিও পুলিশ গোয়েন্দা কেউ ছুঁতে পারত না, গ্যারান্টি|ইন্টারেস্টিং|
সত্যবতীর কথাও লেখাই যেত| আফটার অল, গোয়েন্দাকে
কাবু করে তাঁর ঘরণী হয়ে বসা, এবং তাকে নরমে-গরমে রাখা, প্লাস বরের আইবুড়ো বন্ধুকে সারাজীবন
দেখভাল করা ( সে যতই অজিত বলুক ‘সত্যবতীকে পাইয়াছি একাধারে ভগিনী ও ভ্রাতৃবধূরূপে’)
মুখের কথা নয়| কিন্তু যখন মনে পড়ে ব্যোমকেশের সত্যকে ভালো লাগার কারণ করালীবাবু
মারা গেছেন জেনেও দাদাকে বাঁচানোর জন্যেই চুপচাপ থাকা (‘অন্য মেয়ে হলে চেঁচিয়ে
বাড়ি মাথায় করত – আর আপনি’ ইত্যাদি)তখন আর লিখতে ইচ্ছে করল না|
মিস বিপুলা মল্লিক (চিকিত্সা সংকট/ পরশুরাম) – সাতসকালে
যদি কোনো আধদামড়া ভদ্রলোক একজন মহিলা ডাক্তারের চেম্বারে এসে বলেন তিনি অসুস্থ, এযাবত
হেকিম, বৈদ্য, কবিরাজ দেখিয়েও সে রোগের সুরাহা হয়নি, এবং সেই মহিলা তাঁকে পত্রপাঠ
খেদিয়ে না দিয়ে রোগের নিদান বাতলান, তাঁর জন্যে হাততালি পড়তে বাধ্য| বুদ্ধিমতী|
(এই গল্পটা নিয়ে বহুযুগ আগে বাংলা দূরদর্শনে
সিরিয়াল হয়েছিল| নন্দ বিপুলার কাছে এসেছেন, এই পর্যন্ত দেখিয়ে একটা এপিসোড শেষ
হয়েছিল| আমি তখনো গল্পটা পড়িনি, তাই ভ্যাবলার মতন বাবাকে জিগ্যেস করেছিলাম, আচ্ছা
এই ডাক্তার কী ওষুধ দেবে? বাবা মিষ্টি হেসে বলেছিলেন – একেবারে মোক্ষম দাওয়াই!)
আনন্দীবাই (আনন্দীবাই/ পরশুরাম) – স্বামীর আরও দুটো
বিয়ে আছে, এটা জানার পরে যিনি স্বামীকে ‘ ডেরেন কা ছুচুন্দর’ নামে আপ্যায়িত করে
পিঠে সপাসপ ঝাঁটা চালাতে পারেন, তাঁকে আমার দিব্যি পছন্দ হয়| আর টুনিদিদি (কচি
সংসদ)তো আছেনই| যিনি ‘মাছ কোটা হইতে গাড়ি রিজার্ভ করা অবধি’ সব কাজে পারদর্শী, আর এক
রাতের মধ্যে ‘এক-শ তেষট্টিটা লাগেজ’ বাঁধাছাঁদা করে বাড়িসুদ্ধ সকলকে বগলদাবা করে
দার্জিলিং থেকে কলকাতা পাড়ি দিতে পারেন, তিনি মহীয়সী নন তো কি?
ঝুমুর (শোধ/ তসলিমা নাসরিন) – বিয়ের দেড়
মাসের মাথায় সন্তান আসা নাকি অসম্ভব, তাই পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স করে গৃহবধূ
হওয়া ঝুমুরকে গর্ভপাতে বাধ্য করাবে ভালোবেসে-বিয়ে-করা স্বামী? বেশ|যখন স্বামীর মনে
হয় তাদের এবার একটা বাচ্চা দরকার, তখন নিজের ইচ্ছেমত স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হবে? বেশ|
ঝুমুরও তবে নীচের তলার বউ সেবতির দেওর আফজালের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াবে, নিজের সবচেয়ে
ঊর্বর দিনগুলোয় স্বামীকে ঘেঁসতে দেবে না কাছে| সন্তানের মুখ দেখে হারুন যত খুশিই
হোক, ঝুমুর মনে মনে প্রতিশোধ নেওয়ার আনন্দে হা হা হাসবে| এ তার স্বপ্নের ভ্রূণ নয়,
তার ‘ক্ষোভের, যন্ত্রণার ভ্রূণ’| অনবদ্য|
শ্রীময়ী (শনি-রবি/ নবনীতা দেবসেন) – এমনিতেই নবনীতার
লেখায় মহিলারা শক্তপোক্ত, স্বনির্ভর, প্রত্যয়ী| শ্রীময়ী নিতান্ত অল্প বয়েসেই
মারাত্মক নার্ভের অসুখে হুইলচেয়ারে বন্দী| তাতে কি? সে মেয়ে ‘সাজুনি, ফ্যাশানি’,
পড়াশোনায় রীতিমত ভালো, গীটার বাজিয়ে গান গায়| একমাত্র সিদ্ধার্থ তাকে বিয়ের
প্রস্তাব দিলে সে একটু বেকায়দায় পড়ে বটে, কিন্তু মূলতঃ তার চেষ্টাতেই বাড়ির
বহুদিনের হারিয়ে-যাওয়া ছেলেটির খোঁজ পাওয়া যায়| এরকম চমত্কার একটা গল্প নিয়ে কেউ
সিনেমা বানাচ্ছেন না কেন কে জানে| ইন্সপায়ারিং|
অমৃতা (অমৃতা/ বাণী বসু) – চেনা প্যাটার্ণ| নেহাত
অল্প বয়সেই তথাকথিত ‘ভালো পাত্রে’ মেয়েকে সমর্পণ করে বাবামা দায় সেরেছেন| সেই
লোকটির শরীরের, অভ্যাসের খোঁজ পেয়েছে অমৃতা, মনের নাগাল পায়নি| তার সন্তানসম্ভাবনা
হওয়ার পর স্বামী আর শ্বশুরবাড়ির লোকজন ভ্রূণটিকে নিকেশ করতে চেয়েছে, সহৃদয়
ডাক্তারের হস্তক্ষেপে সেটা এড়ানো যায়| এক বন্ধুর মায়ের কাছে আশ্রয় পায় অমৃতা আর তৈরী
হতে থাকে পরীক্ষার জন্যে| নিজের পায়ে তাকে দাঁড়াতেই হবে| চমত্কার|
মুম (মুম/ বাণী বসু) – বড়ি হাভেলিতে মেয়ে নেই|
মেয়ে জন্মালেই তাকে দুধের কটোরায় চুবিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে যে! বাড়িতে থাকেন বড়ি
মালিক আর তাঁর পঞ্চাশোর্দ্ধ্ব ছেলে| এ বাড়িতে থাকতে আসে একটি বাচ্চা, কোথা থেকে কেউ
জানে না, নাম বলে মুম| সে আসার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িতে ছোটি মালিকের স্ত্রীর আত্মার উপস্থিতি
টের পাওয়া যায়| জীবিত অবস্থায় যাঁর গলার আওয়াজ পাওয়া যেত না, তিনি ভূত হয়ে সবাইকে বকছেন,
রাঁধুনিকে চুরি করতে দিচ্ছেন না, চাকরকে মালিকের স্নানের ঘরে বাথটবে গা এলাতে দেখে
তার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করছেন| যে বড়ি মালিকের হুকুমে তাঁর সদ্যোজাত মেয়েকে তিনি
মেরে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন, তার উপর মারাত্মক প্রতিশোধ নিচ্ছে মুম| হাড়-হিম-করা|
চন্দরা(শাস্তি/ রবীন্দ্রনাথ) – যে স্বামী দাদাকে
বাঁচাতে গিয়ে আমাকে পুলিশের হাতে ঠেলে দিল, বউ গেলে বউ পাওয়া যায় কিন্তু ভাই গেলে
ভাই পাবে না এই ভয়ে, ফাঁসির আগে আমি নাকি তার মুখ দেখব? মরণ !
পদিপিসি (পদিপিসির বর্মিবাক্স/ লীলা মজুমদার) –
মজবুত মহিলা| মুগুর ভাঁজেন, আর গয়নার বাক্স কোথায় লুকিয়েছেন ভুলে গিয়ে কয়েক
জেনারেশন ধরে সব্বাইকে ঘোল খাওয়ান| নমস্য|
এলিস (এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড/ লিউইস ক্যারল) –
চারপাশে ক্রমাগত অদ্ভুতুড়ে ঘটনা ঘটতে থাকলেও, আর একের পর এক উদ্ভট পরিস্থিতিতে পড়েও
যে ছোট্ট মেয়ে মাথা ঠান্ডা করে থাকে, তাকে ভালো না বেসে উপায় আছে? মিষ্টি|
মাসি (বড়মামা সিরিজ/ সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়)
– বিয়ে করেননি| একসেন্ট্রিক ডাক্তার বড়দা, তাঁর প্রায়-পাগলামোর পর্যায়ে চলে যাওয়া
পশুপ্রেম, বাস্তববোধহীন প্রফেসর ছোড়দা এবং তাঁর হাজার বায়নাক্কা, এবং বোঝার-ওপর-শাকের-আঁটি
বোনপো – এই নিয়েই সংসার| খুরে নমস্কার|