Saturday, April 10, 2021

দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কিচেন

 

একটি মেয়ের সম্বন্ধ করে বিয়ে হয় একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে । বিয়ের আগে নাম-কা-ওয়াস্তে একটা নিভৃত আলাপ হয়েছিল হবু বরের সঙ্গে, সে দৃশ্যে দেখা গেছে আলমারিতে সাজানো থরে থরে ট্রোফি - মেয়েটি খুব ভালো নাচত। বিয়ের পরে অবশ্য ভোর না হতেই শাশুড়ির সঙ্গে লেগে পড়তে হয় রান্নাঘরে - বর তখন মন শান্ত রাখতে যোগব্যায়াম করে আর শ্বশুর দাঁত মাজেন - ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে শাশুড়িই দিয়ে যান অবশ্য । পুরুষরা খেতে বসেন, টেবিলে ঝোল, চিবোনো ডাঁটা স্তূপ করে রেখেই বেরিয়ে যান যে যার কাজে । দুই নারী সেসব সরিয়ে প্রাতঃরাশে বসে । 

শাশুড়ি মানুষটি খারাপ নন, নতুন বউকে বেশি রাত অবধি আটকান না । এঁটো বাসন মেজে, রান্নাঘর ঝাঁট দিয়ে তিনি যখন শোবার ঘরে যাবার অবকাশ পান, শ্বশুর ততক্ষণে বিছানায় আধশোয়া হয়ে মন দিয়ে হোয়াটস্যাপে ভিডিও দেখছেন । 

ননদের আসন্ন সন্তানসম্ভাবনার কারণে শাশুড়িকে যেতে হলে রান্নাঘরের পুরো দায়িত্ব নতুন বউটির ঘাড়ে এসে পড়ে। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার - বরের আপিসের টিফিন, শ্বশুরের বিকেলের জলখাবার । সে খেয়েছে কিনা, বা কী খেয়েছে - কেউ জানতে চায় না । রান্নাঘরে আধুনিক গ্যাজেট নেই বললেই হয়, ফ্রিজের খাবার খেলে শ্বশুর টেবিল ছেড়ে উঠে যান, নারকোলের চাটনি শিলনোড়ার বদলে মিক্সিতে বাটলে স্বাদের হানিতে হাহুতাশ করেন, উনুনে হাঁড়ির বদলে গ্যাসে প্রেশারকুকারে ভাত রাঁধলে অসন্তুষ্ট হন । বর কিছুতেই রাতে রুটির বদলে ভাত খেতে রাজি হয় না । ফলে মেয়েটির সারাদিনই কেটে যায় কুটতে, ধুতে, রাঁধতে, মাজতে আর মুছতে । রাঁধার পরে খাওয়া, আবার খাওয়ার পরে রাঁধা । 

রান্নাঘরের পাইপ ফেটে গেলে মিস্ত্রি ডাকতে ভুলে যায় বর, অথচ রাতে আলো নিভিয়ে বউকে ডাকতে ভোলে না । যন্ত্রণাদায়ক মিলনের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে মেয়েটির নাকে লেগে থাকে উপচে-ওঠা ডাস্টবিনের গন্ধ , ফোরপ্লের কথা বরকে বললে সে হেসেই উড়িয়ে দেয় - সব জেনে বসে আছে নাকি তার বউ ? আর আলো জ্বেলে যে ফোরপ্লে করবে, কী আছে তার বউয়ের ?

ঋতুসময় এলে মেয়েটি একটু ছুটি পায় - ও সময়ে নাকি রান্নাঘরে যেতে নেই, তাই এক মহিলাকে ডেকে আনা হয় ওই কয়েক দিন ঘরের কাজকর্ম করতে । মেয়েটিকে অবশ্য ওই কদিন কোণের একটা ঘরে থাকতে হয় - ওই কদিনই একটু নিজের মতো সময় পায় সে । সব মিটে গেলে একদিন খাবার টেবিলে সে কথা তোলে - একটা চাকরি করতে পারে না সে? 

কীসের চাকরি? না, ডান্স টিচারের। শ্বশুরের মতে, ওসব তাঁদের পরিবারে ঠিক সুবিধে হবে না । শাশুড়ি পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ছিলেন, তাঁকেই তিনি বাবার কথা শুনে চাকরি করতে যেতে দেন নি, এখন আর - বরও বলে চেপে যেতে, পরে দেখা যাবে । 

মেয়েটি কী করে কে জানে, একদিন তার নামে খাম আসে একটা । শ্বশুরের হাত থেকে নিতে গিয়ে কৈফিয়ত দিতে হয়, ইন্টারভিউ লেটার । শ্বশুর বোঝান, চাকরি করতে যাওয়ার কী দরকার, ঘরে থাকলেই তো মেয়েদের মানায় ভালো?  সবাইকে দেখা, সকলের সুখসুবিধে দেখা - এ কি একটা ফেলে দেওয়ার মতো ব্যাপার ? - ইত্যাদি, যা দিয়ে নিশ্চিত করা যায় সেবা, সাহচর্য, শ্রম ।  রাতে বর শুনে এসে রাগ দেখাল - কী দরকার ছিল আগে বাড়িয়ে এসব করার ?

বর শ্বশুর শবরীমালায় যাবেন, আবশ্যিক ব্রহ্মচর্য নিলেন। মেয়েটি আবার ঋতুমতী, তার ঠাঁই একটা দমচাপা ঘরে । ছেলের মাসি এসে তার শোয়ার ব্যবস্থা করে দেন মাটিতে ও মাদুরে । মেয়েটি মোবাইলে দেখে শবরীমালায় ঢোকার অধিকার চাইছে মেয়েরা, রাতের অন্ধকারে লাঠিসোঁটা নিয়ে একদল পুরুষ ভয় দেখিয়ে যাচ্ছে এক প্রতিবাদীকে, স্কুটি পুড়িয়ে দিচ্ছে সেই মেয়ের । সে ভিডিও শেয়ার করলে বর বলতে আসে, ভিডিওটা মোছো দেওয়াল থেকে । মেয়েটি দরজার আড়াল থেকে জবাব দেয়, না । বর মারমুখী হয়ে তেড়ে আসতে গেলে হেসে মনে করায়, কী করবে তুমি? এই একচল্লিশ দিন আমার কাছে আসা বারণ তোমার, জানো না ?

সাত দিন পর নেয়ে ধুয়ে রান্নাঘরে ঢুকলে হাঁক আসে, এই এত কাপ চা চাই, যেমন অতিথি এলে আসত । কিন্তু এবার আর মেয়েটি চা দেয় না কাউকে । বর আর শ্বশুরকে রান্নাঘরে শিকল দিয়ে রেখে সে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায় । আর ফিরবে না বলে ।   


আমাদের এক আত্মীয়া ছিলেন । স্বামীর খাওয়ার সময়ে সামনে বসে থাকাটা তাঁর অবশ্যকর্তব্য ছিল । স্বামীদেবতাটিকে ইনস্টলমেন্টে খেতে দিতে হত কিনা, তাই । মানে প্রথমে একটু ভাত, তেঁতো দিয়ে । তারপর আরেকটু, ডাল-তরকারির সঙ্গে । আবার আরেকটু, মাছ বা মাংসের সঙ্গে । তারপর পাতে চাটনি পড়ত । শেষে টক দই । প্রচণ্ড অসুস্থ অবস্থাতেও এভাবে পরিবেশন করে গিয়েছিলেন তিনি । স্বামীটির মনে হয়নি এবার অভ্যেসটা পাল্টানো দরকার । 

তখন ইশকুলের মাঝামাঝি ক্লাসে পড়ি, কী প্রসঙ্গে শিক্ষক অদ্রীশ বিশ্বাস ক্লাসে আলোচনা করছিলেন, অমুক কাজটা কে করে তোমাদের বাড়িতে, বাবা না মা ? তমুকটা? বাথরুম কে পরিষ্কার করে ? খেতে দেয় কে? শেষে এও বলেছিলেন, এসব নিয়ে বাড়ি ফিরে একটু কথা বলে দেখো তো । পরদিন একটি মেয়ে বলল, মা বলেছেন, এ আবার বলার কী আছে, মা ভালোবাসেন, তাই খেতে দেন । অদ্রীশস্যার বললেন, আচ্ছা, মা যদি বলেন, আমি সন্তানকে ভীষণ ভালোবেসে তাকে একটি স্নেহচুম্বন দেব, কিন্তু তাকে খেতে দিতে আমার অনিচ্ছা, তাহলে ?

পরিবারের প্রয়োজনে, সন্তানের প্রয়োজনে ছুটি স্ত্রী বা মা-ই আগে নেন । 

পরিবারের/ সন্তানের প্রয়োজনে কর্মরতা স্ত্রী বা মা-ই আগে চাকরি ছাড়েন । 

কর্মক্ষেত্র থেকে সমান ক্লান্ত হয়ে ফিরে গৃহকর্মে ঢোকেন স্ত্রীই । অতিথি এলে খাবারদাবারের দায়িত্বও  স্ত্রীরই ।

বিয়ের পরে মেয়েটিরই দায় ও দায়িত্ব নতুন পরিবারে গিয়ে মানিয়ে নেওয়া ।

(এই প্রত্যেকটি অবস্থারই এক্সেপশন কিছু বিরল ক্ষেত্রে অবশ্যই আছে । এবং পরিস্থিতি খুব ধীরে হলেও পাল্টাচ্ছে, এই আশার কথা ।) 

উপরের সব কটা পরিস্থতি এক-একরকমের সাধারণীকরণ । এত স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে,  জেনেরালাইজেশন বলে  এগুলোকে আর চেনাও যায় না । অথবা বড়োজোর ‘ওসব আমাদের ফ্যামিলিতে হয় না ‘ বলে কার্পেটের তলায় ঠুসে দেওয়া হয় ।

দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কিচেন এই ছবিটাই দেখায় । দেখানোর ভঙ্গীটা নিস্পৃহ, নির্মোহ, অভিনয় সংলাপ সবটাই নিচু তারে বাঁধা , অতএব অভিঘাতটা জোরদার । 

অসামান্য অভিনয় করেছেন নিমিশা সাজায়ান। তাঁর অ-নায়িকাসুলভ চেহারা, অপরিষ্কার তেলতেলে মুখ - সব ঢেকে যায় পর্দা জুড়ে তাঁর অনায়াস বিচরণে । চরিত্রের ক্লান্তি, হতাশা, ক্ষোভ - একটি ফ্রেমেও অতি-অভিনয় না করে নিমিশা দেখিয়েছেন তা । বাকিরাও যথাযথ । 

এ ছবি সেসব পুরুষদের দেখা উচিত, যাঁরা জীবনে জলটুকু গড়িয়ে খেতে শেখেননি বা রান্নাঘরে ঢোকেননি । এ ছবি সেসব মহিলাদেরও দেখা উচিত, যাঁরা স্নেহে বা ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে জলটুকু গড়িয়ে খেতে শেখাননি বা রান্নাঘরে ঢুকতে দেননি । আমাজন প্রাইম, ৯.৫/১০। দেখুন দেখুন দেখুন ।





  


Sunday, July 26, 2020

প্রথম প্রচেষ্টা


লুচি=পাঁপড়৷ 

প্রণালী:
১॥ মনে লুচি খাওয়ার অদম্য ইচ্ছে জাগিয়ে তুলুন৷ জোর করে 'ক্যালোরি' শব্দটা কয়েক ঘন্টার জন্য লকারে ঢোকান৷ নিজের সাহসে না কুলোলে উদার বন্ধুকে উসকান, 'হ্যাঁরে তুই কি লুচিতে ইন্টারেস্টেড?'
২॥ কল দ্য এক্সপার্টস৷ মা—কে ফোন করুন৷ মাসিকে হো আ তে লিখুন, 'লুচি কী করে বানায়?'
৩॥এক্সপার্টদ্বয়কে প্রচুর প্রশ্ন করুন৷ মনে মনে নোট নিন৷ আপনি এক উদভ্রান্ত আদিম যুগে ভালো ছাত্রীই ছিলেন৷
৪॥ তাঁরা মোটামুটি ময়দা, তেল, জল প্রভৃতির হিসেব দিলে ও কড়ায় লুচি ছাড়ার পদ্ধতি বলে দিলে, রেওয়াজে বসুন৷ গানবাজনায় ব্রেন শার্প হয়৷ 
৫॥ 'করব কি করব না'র দোলাচলে ভুগুন৷ উদার বন্ধু সেই ফাঁকে আলু—মরিচ বানিয়ে ফেলুক যাতে আপনার আর পরিত্রাণ না থাকে৷
৬॥ 'আমি কি ডরাই কভু সামান্য লুচিতে' ভাঁজতে ভাঁজতে রান্নাঘরে ঢুকুন৷ ময়দা, তেল, নুন, জল সব দিয়ে মাখুন ও একটি চ্যাটচ্যাটে পিণ্ডি তৈরি করুন৷ 
৭॥ হাত ধুয়ে মা—কে ফোন করে বলুন, 'সব ঘেন্টি পাকিয়ে গেছে৷' তিনি ট্রাবলশুট করলে আরো ময়দা ঢেলে সামলান৷ 
৮॥ইন্ডিয়ান ম্যাচমেকিং চালিয়ে লেচি কাটুন৷ গোল্লা পাকাতে পাকাতে ভাবুন, কতটা লুচি বানালে তবে মায়ের স্ট্যান্ডার্ডে যাওয়া যায়?
৯॥ বেলতে শুরু করুন৷ ইন্ডিয়ান .... দেখতে দেখতেই৷ একেবারে ফিনফিনে করে বেলুন৷ নিজে প্লাস সাইজ তো কী? লুচিকে সাইজ জিরো করে ফেলুন৷
১০॥কড়ায় তেল দিন৷ মা বলেছেন, অনেকটা তেল লাগে৷ অতএব হাফ কড়া তেল দিন দশটা লুচির জন্য৷
১১॥লুচি এক এক করে ছাড়ুন ও পাঁপড় ভেসে উঠতে দেখুন৷ ছাঁকনিতে তুলে টিস্যুতে রাখুন৷
১২॥ রান্নাঘর ছ্যাড়াব্যাড়া করে ফেলে রেখেই খেতে বসুন৷ খিদের বাড়া তরকারি নেই, জানেন তো?

Saturday, July 25, 2020

কবিতা, ছাব্বিশে জুলাই ২০২০।

সেদিন বাদলবেলা, মেঘে মেঘে প্রবল আষাঢ় 
বাহিরে বর্ষণ আর ঘরখানি নিবিড় আঁধার 
ভিজে যায় উপত্যকা, ভেসে যায় প্রাচীন পাহাড়
পৃথিবীর আদি নারী ডুবে যায় পুরুষে তাহার  
নখরে বিদ্যুৎ ছোটে; চুম্বনে চুম্বনে বজ্রপাত 
আগুন মিশেছে ঝড়ে; কে দিল এ দুয়ারে আঘাত   

তার পর, হেমন্ত| তার পর কী গভীর শীত 
একাকী চায়ের কাপ। মন কো তো না মিলা রে মিত 
তার পর ছাতা হাতে গলি ঘুরে একা ঘরে ফেরা 
তার পর উড়ে গেছে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত মেঘেরা 
সাঁঝের পূরবী ছুঁয়ে ভেজা ঠোঁটে নামে না মল্লারও 
পুরুষ, শ্রাবণদিন আর কি ফিরিয়ে দিতে পারো?  

ও - রাস্তায় হাঁটুজল| এ-ভবনে ঊষর আঙিনা|

বল তবে, পলাতক, কেন তোকে ভুলতে পারি না !

Saturday, July 11, 2020

সুতো

ইউটিউবে 'অপুর সংসার' (গেম শো) -র একটা এপিসোড দেখছিলাম । (শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের মতো অনবদ্য অভিনেতা গেম শো-র এঙ্কর হয়ে কাল কাটাচ্ছিলেন, বড়ো নিদারুণ ব্যাপার, কী আর করা যাবে । )  অতিথি হয়ে এসেছিলেন দুই কিংবদন্তী অভিনেত্রী - মাধবী মুখোপাধ্যায় এবং সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় । বাংলা ছবির স্বর্ণযুগে এঁরা দুজনেই রুপোলি পর্দা আলো করে রেখেছিলেন অভিনয়ের গুণে, এখনো হাঁকড়ে ব্যাটিং করছেন দুজনেই । 

সঞ্চালকের এক প্রশ্নের উত্তরে সাবিত্রী বলছিলেন, তাঁকে কিশোরীবয়সে বাংলা ছবিতে 'ভিড়ের মধ্যে' দাঁড়াতে হয়েছিল রোজগারের তাগিদে । নাচতেও হয়েছিল গ্ৰুপে। তার বদলে পেয়েছিলেন ১৫ টাকা ।
উত্তরে শাশ্বত যা বললেন, সেটা সম্ভবতঃ এই নেপোটিজম-অভিযোগলাঞ্ছিত দুনিয়ায় বাঁধিয়ে রাখার মতো ।  
- সাবিত্রী চ্যাটার্জিকে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে শুরু করতে হয়েছিল! এসব শুনলে মনে হয়, আমরা অনেক ভালো আছি । ... যাঁরা আজ ভিড়ের মধ্যে দাঁড়াচ্ছেন এবং আক্ষেপ করছেন যে কেন আমি বড় চরিত্র পাচ্ছি না, তাঁরা একটু লড়ে যান । দেখবেন, একদিন না একদিন পাবেন । সাবিত্রী চ্যাটার্জি হওয়া সকলের পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু শাশ্বত চ্যাটার্জি অন্ততঃ হতে পারবেন।  

এই এপিসোড আমি সেদিন থেকে প্রায় অন লুপ দেখছি এবং শুনছি । এবং সেটা এই কটি কথা বার বার শোনার জন্যই । (সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় এখনো হাঁটুর বয়সী বহু অভিনেতাকে গুণে গুণে একশো গোল দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, 'প্রাক্তন'এ তাঁর 'কামরামে বহুত আরশোলা হ্যায়, ফুর ফুর ফুর ফুর করকে উড়তা হ্যায়' অবিস্মরণীয় । )
তা মাধবী-সাবিত্রী আসবেন আর উত্তমকুমারের প্রসঙ্গ আসবে না, অসম্ভব । সৌরভ দাস মাধবীর সঙ্গে অভিনয় করলেন 'আমি কোন পথে যে চলি'তে, শাশ্বত হাত পা নাড়লেন সাবিত্রীর সঙ্গে 'এবার মলে সুতো হব'তে । দুটোই দুর্দান্ত গান, দুটো ছবিই বার বার দেখার মতো, এবং দুটোরই নায়ক উত্তমকুমার । 

Tuesday, July 7, 2020

সোনালী গুবরে পোকা, বা কুকুর কেন বেড়ালকে দেখতে পারে না (চীনদেশের লোককথা) (The Golden Beetle, or Why the Dog hates the Cat)



কাল কী খাব জানি না রে। শ্রীমতী ওয়াং বললেন তার বড় ছেলেকে । 

ওয়াং বিধবা, অবস্থা মোটেই ভালো নয়। হাতে তেমন পয়সাকড়ি নেই, ছেলে মিং লি একটা দোকানে ছোটোখাটো চাকরি করে, দিনের হিসেবে মাইনে পায় । এদিকে গত শীতে প্রচণ্ড বরফ পড়ে ছাদের একটা অংশ ধসে গিয়েছিল, হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়েছিল দেওয়াল । বিপদের উপর বিপদ, মিং লি সারারাত জেগে ঠান্ডা লাগিয়ে নিমোনিয়া বাধিয়ে বসেছিল । বহুদিন বিছানায় পড়েছিল, ওষুধবিষুধডাক্তারে টাকাপয়সা খরচ হয়েছিল জলের মতো । শেষ হয়ে গিয়েছিল যৎসামান্য সঞ্চয়, অনেক দিন কাজে যেতে না পারায় চাকরিটা গিয়েছিল মিং লি-র । যে দোকানে সে কাজ করত, সেরে উঠে সেখানে গিয়ে সে দেখেছিল, সেখানে অন্য লোক রাখা হয়েছে। এদিকে অসুখ থেকে উঠে হাতে পায়ে জোর পায় না, মাথা টলমল করে, এক হাত মাটি কাটতে গেলে দশবার হাঁপায়, কাঠ কাটতে গেলে আধ ঘণ্টার কাজে দু ঘন্টা লাগায়, আশেপাশের গাঁয়েও কেউ তাকে কাজ দিল না। বেচারা রোজই কাজের খোঁজে বেরোয়, আর সন্ধেয় মুখ চুন করে বাড়ি ফিরে আসে । মুখে মা-কে বলে বটে 'সব ঠিক হয়ে যাবে' কিন্তু ভেতরে ভেতরে মায়ের ছেঁড়া কাপড় আর শুকনো চেহারা দেখে বড্ড কষ্ট পায় ।

ভগবান কিছু একটা ঠিকই জুটিয়ে দেবেন, মা। খুঁজেপেতে কোথাও কি আর কিছু টাকাকড়ি পাব না? মিং লি হেসে বলল বটে, কিন্তু কোন দিক দিয়ে কী সুরাহা হবে সে কিছুই ভেবে পাচ্ছিল না । 

ছেলে বেরিয়ে গেলে ওয়াং রান্নাঘরে খুটুর খাটুর করতে থাকেন । কোথাও যদি মেলে একটু ময়দা,এক টুকরো আলু, বাসনকোসন কৌটোবাটা ঝেড়ে যদি বেরোয় একমুঠো চাল । 
আহা, বাছা আমার সারাদিন খাটে, কীই বা তুলে দেব ওর মুখে, মনে মনে বলেন তিনি। আধপেটা খেয়ে কত দিন কেটে গেল, এবার কি ঈশ্বর দয়া করবেন না? আহা, না খেয়ে ফুটফুটি আর কেলটুশও হাড্ডিসার হয়ে গেল গো !

ঘরের এক কোণে জড়াজড়ি করে পড়ে ছিল বেড়াল ফুটফুটি আর কুকুর কেলটুশ। সব শুনে মিহিগলায় তারা সাড়া দিল, মিঁউ মিঁউ । ভৌ ভৌ । খেতে না পেয়ে পেয়ে বেচারারা রোগা কাঠি হয়ে গেছে, উঠে খাবার খুঁজতে যাওয়ার শক্তিটুকুও নেই । 

হঠাৎ দরজার কড়াটা খটাখট শব্দে নড়ে উঠল । দরজা খুলে ওয়াং দেখেন টাকমাথা এক বুড়ো সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে। ইনি আবার কিনি? সাধুসন্নিসিকে সিধে দেওয়ার নিয়ম, ইনি সেরকম কিছু চেয়ে বসলেই চিত্তির ।
কিছুই যে নেই আমাদের, বাবা, হাত জোড় করে তড়বড় করে বলেন ওয়াং, আমরা গত দু হপ্তা কী খেয়ে বেঁচে আছি শুধু আমরাই জানি । কুড়িয়ে কাচিয়ে যা পাওয়া যায় তাই দিয়ে পেট চালিয়েছি। আজ মিং লি-র বাবা থাকলে আমাদের এমন দুর্দশা হত না । ওই যে বেড়ালটা, এত মুটিয়েছিল যে ছাদে অবদি চড়তে পারত না, এখন দেখুন তার অবস্থা, পাঁজরা গোনা যায় । আমাদের মাপ করবেন বাবা, আমরা বড়ো দুঃখী ।
সন্ন্যাসী হেসে ফেলেন । আমি ভিক্ষে নিতে আসিনি রে, বেটি । ঈশ্বর তোর প্রার্থনা শুনেছেন, তোর কষ্ট দেখেছেন । তোর ছেলেটি বড় ভালো, এত কষ্টেও তোকে আগলে রেখেছে যতদূর সম্ভব। ওর হাতে কাজ নেই, তোদের পেটে খাবার নেই, সব জেনেই আমি এসেছি রে । 

ওয়াং হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন । সন্নিসিঠাকুর এত জানলেন কী করে ?
সন্ন্যাসী কাঁধের ঝোলা থেকে একটা জিনিস বের করে ওয়াংয়ের হাতে দেন। এই নে, এটা ধর। 
ওয়াং হাতে নিয়ে দেখেন, একটা সোনালী গুবরে পোকা, চোখের জায়গায় লাল মীনে করা । দিব্যি দেখতে, বেশ ভারী জিনিস । এটা বেচলে বেশ কদিনের বাজরা (millet) জোগাড় হয়ে যাবে । 
খবরদার!  এটা বেচবার কথা চিন্তাও করবি না । সাধুবাবার গমগমে গলা শোনা গেল এবার। এই গুবরে পোকায় জাদু করা আছে। যতদিন এটা তোর কাছে থাকবে, খাবারদাবারের কোনো অসুবিধা হবে না । খাবার সময় হলে এই পোকাটা একহাঁড়ি ফুটন্ত জলে ফেলে চাপা দিয়ে দিবি, আর যা খেতে ইচ্ছে তার নাম জোরে জোরে আওড়াবি । মিনিট তিনেক পরে ঢাকনা খুলবি,  দেখবি তোর পছন্দের খাবার হাজির । তার সোয়াদগন্ধ তোর ধারণারও বাইরে । 

ওয়াং হাঁ করে শুনছিলেন, বললেন, এবার তাহলে পরখ করে দেখি, বাবা?
বাবা হাসলেন । তর সইছে না রে, বেটি ? আমি চলে যাই, তারপর চেষ্টা করে দেখিস ।

সন্ন্যাসী চলে গেলে দোরটুকু বন্ধ করতে যা দেরি, ওয়াং লাফিয়ে পড়ে আগুন জ্বালালেন , একহাঁড়ি জল ফুটতে দিয়ে তার মধ্যে গুবরেটাকে ছেড়ে দিলেন । 
আর ঘুরে ঘুরে বিড়বিড় করতে লাগল,
ভাপা পিঠে ভাপা পিঠে, বড়োই জ্বালা পেটে 
ভাপা পিঠে আয় রে আমার হাঁড়ির ভিতর হেঁটে 
আয় আয় ভাপা পিঠে, খিদেতে প্রাণ যায় 
আয় আয় ভাপা পিঠে, গরম গরম খাই ।
সন্ন্যাসী যদি সত্যি না বলে থাকেন? যদি সবটাই ধাপ্পাবাজি হয়ে থাকে? উঃ, তিন মিনিট কী লম্বা !

ঘড়ি ধরে ঠিক তিন মিনিট পর হাঁড়ির ভিতর থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করল, তারপর পটাং করে খুলে গেল ঢাকনাটা । ঘর ভরে গেল খাবারের গন্ধে । 
ওয়াংয়ের চোখ বড় বড়, মুখ হাঁ । হাঁড়ির মধ্যে থরে থরে সাজানো নরম, তুলতুলে, পুরুষ্টু ভাপা পিঠে । 
ওয়াং দুহাত ডুবিয়ে পিঠে খেতে লাগলেন । গরমে মুখ পুড়ে যায়, ধোঁয়ায় মুখে ছ্যাঁকা লাগে, ওয়াং খেতেই থাকেন, খেতেই থাকেন । কী তার সোয়াদ, কী গন্ধ ! খেয়ে এত সুখ তা কে জানত! ওয়াং খেতে থাকেন যতক্ষণ না পেট আইঢাই করে ওঠে । কুকুর আর বেড়ালটাকেও খাওয়ান ঠেসে ঠেসে।

ভগবান তাহলে মুখ তুলে চাইলেন, কী বল? কেলটুশ ফুটফুটিকে বলল । দুটোতেই খেয়ে দেয়ে পেট ঢাপ্পুস করে বারান্দায় রোদে শুয়ে ছিল। কী কষ্ট গেছে, বাপ রে ! আর কয়েকদিন এরকম চললে পালিয়েই যেতাম বোধ হয় ।
এদিকে ওয়াং ভাবছিলেন কখন ছেলেকে সুখবরটা দেবেন । আহা বাছা কতদিন পেট ভরে খেতে পায় নি,  আজ সামনে বসিয়ে ওকে আদর করে খাওয়াব ।
মিং লি ফিরল মুখখানা কালো করে । আজও কাজ জোটেনি তার । বেচারা ভাবতে ভাবতে আসছিল রাতে মায়েপোয়ে কী খাবে, বা আদৌ কিছু খাবে কি না, কিন্তু দরজা খুলে মায়ের মুখে হাসি দেখে বেচারা হকচকিয়ে গেল ।
আয়, আয়। আহারে, বাছার আমার মুখখানা শুকিয়ে গেছে । ওরে, এতদিনে ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন, আর আমাদের খাবার কষ্ট থাকবে না। হাঁড়িতে ফুটন্ত জল, তাতে সোনালি কী একটা ফেলে দিল মা । দেখে মিং লি-র আক্কেল গুড়ুম । অভাবের চোটে, খিদের জ্বালায় মায়ের মাথাটাই কি গেল তবে ? আর কিছুই তো নেই, গায়ের এই শার্টখানা বেচে যদি -
কেলটুশ হাত চাটছিল লি-র । আরে ঘাবড়াও মৎ, সব ঠিক হো গিয়া । ফুটফুটে গুরগুরগুর শব্দ করছিল গলায়, লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল চেয়ার থেকে মোড়ায় ।
মিং লি-র বোধবুদ্ধি কাজ করছিল না, তার মধ্যেই সে শুনল মা বলছেন -
শিগগির শিগগির খেতে বসে পড়, বাবা, মাংসের পিঠেগুলো ঠান্ডা হয়ে যাবে যে ! 
মিং লি নিজের কাঁকে বিশ্বাস করতে পারছিল না । মাংস? পিঠে? এসব কী? শেষ কবে এসব খেয়েছিল সে? ততক্ষণে অবশ্য তার চোখ চলে গেছে টেবিলের দিকে । সেখানে থরে থরে সাজানো শুয়োরের মাংসের পিঠে, ধোঁয়া উঠছে সেখান থেকে । 
আগে খেয়ে নে, বাবা । ছেলেকে বললেন ওয়াং । পেট ভরে খেয়ে নে, তারপর সব বলব ।
মিং লি-কে আলাদা করে বলার কিছু ছিল না অবশ্য । সে ততক্ষণে ঝাঁপিয়ে পড়েছে খাবারের ওপর, হুসহাস করে গিলছে সুস্বাদু পিঠে। মাংসের স্বাদ মিলিয়ে যাচ্ছে জিভে, একের পর এক গরম পিঠের টুকরো নেমে যাচ্ছে গলা বেয়ে । 
ওয়াং একদৃষ্টে চেয়ে ছিলেন  ছেলের দিকে । আহা, বেচারা কতদিন পেট ভরে খায়নি। খাক খাক, তারপর তিনি ওকে সব বলবেন ।
মিং লি-র খাওয়া শেষ হওয়া অবধি অবশ্য তাঁর তর সইল না । অনেকটা খাবার মুখে নিয়ে ছেলে যখন একটু দম নিচ্ছে, তখন হাতে গুবরেটাকে এনে তিনি ছেলের সামনে ধরলেন । 
মিং লি-র চোখ বড় বড় হয়ে গেল । ও বাবা, সোনা না কি ? কোন দেবদূত এসে দিয়ে গেল এটা, মা?
ওয়াংয়ের কথা ফুরোচ্ছিল না । সে দেবদূতই বটে বাবা, কিন্তু দেখতে সন্নিসিঠাকুরের মতো। উনি এইটে দিয়ে গেছেন আমাদের । 
মিং লি-র মাথায় কিচ্ছু ঢুকছিল না । এই পোকাটার সঙ্গে এসব খাবারের সম্পর্ক কী? 
ওদিকে ওয়াং গড়গড় করে বলে যাচ্ছিলেন গুবরেটার বৃত্তান্ত। কীভাবে ওটাকে জলে সেদ্ধ করা হল, কীভাবে হাঁড়িভর্তি পিঠে পাওয়া গেল - সব।  মিং লি-র খাওয়া ততক্ষণে শেষ হয়ে গিয়েছিল, বাকি পিঠেগুলো তিনি নামিয়ে দিলেন কেলটুশ আর ফুটফুটির সামনে । মিং লি হাঁ করে তাকিয়ে রইল । সমস্ত বেঁচে যাওয়া খাবার যত্ন করে তুলে রাখা হবে, এরকমটাই সে দেখে এসেছে এতকাল । খাবার ফেলাছড়া করে নষ্ট করার সুযোগ তাদের কোনোদিনই হয়ইনি ।

এর পরে কদিন কী আনন্দ, কী আনন্দ । মা, ছেলে, কুকুর, বেড়াল - কারোরই কোনো অভাব নেই, খাওয়ার কষ্ট নেই - যখন যা চায় তাই পায় -  দিনে দিনে মিং লি-র গায়ে গত্তি লাগল, চেহারায় চেকনাই এল, কাজে যাওয়ার দরকার পড়ল না আর । বসে বসে সে কুঁড়ে হয়ে যেতে লাগল, কুকুর আর বেড়ালটা বসে বসে খেয়ে মোটা হয়ে গেল, চকচকে হয়ে গেল তাদের চামড়া ।  
এই অবধি হলে কোনো অসুবিধে ছিল না , কিন্তু এবার মা-ছেলের বুদ্ধি বিগড়োলো । নিজেদের সুখ কি অন্যকে না চোখে আঙ্গুল দিয়ে না দেখালে আরাম হয়? ভালো লাগে বন্ধুবান্ধবকে নেমন্তন্ন করে ধনদৌলত না দেখালে? ওয়াংরাও নেমন্তন্ন করতে লাগল আত্মীয়স্বজন, চেনাপরিচিতদের, আর দারুণ সব খাবার খাইয়ে তাক লাগিয়ে দিতে লাগল তাদের । 
একদিন এলেন শ্রী ও শ্রীমতী চু । এঁরা খানিক দূরে থাকেন, তাই আগে আসতে পারেন নি । ওয়াংরা অনেক দিন থেকেই ডাকাডাকি করছিলেন, এঁরা আজ কাল করে এড়িয়ে যেতেন । মনে ভাবতেন এসে আর কী হবে, খাওয়াবে তো শুকনো রুটি আর একটা ঘ্যাঁট, যাওয়া আসার পরিশ্রমই সার ।
কিন্তু  এসে তাঁদের চক্ষু চড়কগাছ !  কোথায় শুকনো রুটি, কোথায় অখাদ্য ঘ্যাঁট? টেবিলভর্তি সুস্বাদু গরম খাবারদাবার। কী তার চেহারা, কী তার খোশবাই ! আর পরিমাণে এত যে, চারজন মিলে গাণ্ডেপিণ্ডে গিলেও শেষ করা গেল না । 

ওঃ কী খেলাম, কী খেলাম ! কোত্থেকে এসব জোগাড় করল কে জানে। মিস্টার চু বাড়ির তালা খুলতে খুলতে বললেন। ওয়াংদের বাড়ি থেকে ফিরে এসে তাঁর চোখে পড়ছিল, বাড়ির দেওয়ালে শ্যাওলা ধরেছে, সামনের বাগানটা আগাছা ভর্তি, জানালার পর্দাগুলো কাচা হয়নি কতকাল।
জানবে আর কী করে, কোনো দিকে কি হুঁশ থাকে তোমার ! আমি জানি খাবারটা কোত্থেকে এসেছে । বললেন শ্রীমতী চু। ওয়াং বুড়ি হাঁড়ি থেকে একটা কী যেন মাদুলি না গয়না কী যেন বের করে রান্নাঘরের একটা তাকে গুঁজে রাখল দেখলাম । কিছু একটা তুকতাক করছিল নির্ঘাত, শুনলাম বিড়বিড় করে খাবারের নাম বলছে । তাঁর স্বামীর মতো অতখানি আলাভোলা হলে তাঁর  চলে না, চোখকান খোলা রাখতে হয় ।
তুকতাক? তাই হবে তাহলে । আমাদেরও যেমন কপাল, এসব জোটে না। সারাজীবন অন্যের দিকে তাকিয়েই দিন যায় । শ্রী ওয়াং দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। 
আচ্ছা, ওয়াংদের ওই মাদুলিটা একটু নিয়ে আসা যায় না? ক’দিন পেট ভরে খেয়ে নিতুম? চাইলে দেবে না, না ? ফেরত তো দিতেই হবে, দিয়েও দেব, শুধু ওই কটা দিন মাত্র -
অমনিই কী আর দেবে? দামী জিনিস, কাজের জিনিস, অষ্টপ্রহর চোখে চোখেই রাখে নির্ঘাত। আনবই বা কীভাবে? বাড়ি ফাঁকা হবে, তবে না? থাকে তো একটা ঘরে, ছেলেটাকেও কাজে যেতে হয় না আজকাল। জিনিসটা আনব কীভাবে? উঃ বাপরে, গরিবের ঘর থেকে জিনিস আনাও ঝকমারি । হত রাজারাজড়ার ঘর, টুক করে উঠিয়ে আনতাম, কেউ খেয়ালই করত না । 

শ্রীমতী চু-র হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে যায় । আরে, সেদিন ওয়াং বুড়ি ছেলেকে কী একটা মেলায় যাবার কথা বলছিল না? মনে পড়েছে, বড় মন্দিরের সামনের মেলা। কখন নিয়ে যাবার কথা বলছিল বুড়ি? দুপুর দুপুরই না? ঠিক ঠিক। তাহলে তো তখন বাড়ি ফাঁকা থাকবে অনেকক্ষণ। তখনই তো কাজটা সেরে ফেলা যায় । 
যেই না ভাবা, অমনি গিয়ে মিস্টার ওয়াংকে ধরলেন তিনি । বেচারা ভদ্রলোক আরাম করে একটু গড়াচ্ছিলেন, শুনেটুনে আঁতকে উঠলেন ।
আরে পাগল নাকি ! ওই কেলে কুকুরটা আছে না? বাড়িতে ঢুকবে কেমন করে? 
আরে দূর দূর, কেলটুশ আবার একটা মানুষ নাকি ! ও ব্যাটা তো মোটা হাতি হয়ে গেছে, নড়তেই পারে না, কেবল এ-পাশ ও-পাশ গড়ায়, ওটাকে আবার ভয় কীসের? আর যদি ওরা আচমকা এসেই পড়ে, বলব আমার খোঁপার কাঁটাটা হারিয়ে গেছিল, খুঁজতে এসেছি । মিটে গেল!
চু খুশি হতে পারছিলেন না। আচ্ছা যাচ্ছ যাও, কিন্তু মনে রেখো, আমরা কিন্তু জিনিসটা ধার নিচ্ছি, আবার ফেরত দেব, কেমন? ওরা আমাদের আদর করে খাইয়েছে, বন্ধুলোক, আমরা ওদের জিনিস চুরি করছি না কিন্তু, মনে থাকবে?
আর মনে থাকবে ! শ্রীমতী চু হন হন করে হেঁটে ওয়াংদের বাড়ি পৌঁছালেন, তারপর একছুটে জিনিস নিয়ে বাড়ি ।  এমন নিঃসাড়ে চুপিসাড়ে কাজটা হল যে কাকপক্ষীতেও টের পেল না । কুকুরটা অচেনা লোক দেখে টুঁ শব্দটিও করল না, বেড়ালটা চোখ পিটপিট করে পাশ ফিরে শুল ।

এদিকে মেলা থেকে ফিরে ওয়াং আর মিং লি-র মাথায় বাজ পড়ার দশা । ঘুরে ঘুরে দুজনেরই পায়ে ব্যথা, ভেবেছিল ফিরে এসে রাতের খাবার গরম গরম খাবে। কিন্তু কোথায় কী! সাত রাজার ধন মানিক গায়েব, আলমারির খোপ ফাঁকা । সারাবাড়ি হাঁটকেও জিনিসটা পাওয়া গেল না। খুঁজেপেতে ক্লান্ত হয়ে মা-ছেলে যখন রণে ভঙ্গ দিল, তখন ঘরদোরের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল একটা ঝড় বয়ে গেছে । 
সেদিন রাতে ঢকঢক জল খেয়ে খিদে চেপে শুয়ে রইল দুজন । কিন্তু তার পরে সকাল আছে, দুপুর আছে, রাত আছে । আছে আরও অনেক অনেক দিন।  মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকলে পেট তো কথা শুনবে না। তাই উঠতেও হয়, আর কুড়িয়েবাড়িয়ে খুদকুঁড়োর ব্যবস্থাও করতে হয়। 
উঃ, খিদে কি ভয়ানক ! খাবার জোগাড় করা কি কঠিন ! সুখের কয়েক মাসে মা-ছেলে খাবারের কষ্ট প্রায় ভুলেই গিয়েছিল, এখন সে কষ্ট যেন দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এল । যে সব ভালো ভালো খাবার ফেলেছড়িয়ে খেয়েছে তারা গত কয়েক মাসে, এখন তার কল্পনাও অসম্ভব । এখন দুবেলা দুটি জুটলেই যথেষ্ট ।
কেলটুশ আর ফুটফুটির অবস্থাও কাহিল । এ ক’মাসে খেয়ে দেয়ে মোটা হয়েছে বিলক্ষণ, খাবার ঢুঁড়ে নেওয়ার অভ্যেসও গেছে চলে । বেচারারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় আর এখানে এক মুঠো ভাত, ওখানে একখানা হাড় - অন্য কুকুরেরা যা ছুঁয়েও দেখে না, যা পায় তাই খায় । দেখতে দেখতে দুটোরই হাড্ডিসার চেহারা, গায়ের লোমে চিট ময়লা, মেজাজ সর্বদাই খেঁকুটে। আগে দুজনে দুজনকে চোখে হারাত, এখন কাছাকাছি গেলেই ঘ্যাঁক ।

হ্যাঁরে তুই এত খিটপিট করিস কেন আজকাল? পাগল হলি নাকি?  কেল্টুস বলেই ফেলল ফুটফুটিকে । ফুটফুটি সকাল থেকে দুবার ফ্যাঁস ফ্যাঁস করে তেড়ে গেছে তার দিকে । 
 পাগল হব কেনরে কেলেমানিক, আমি কি তোর মতো মাথামোটা? আমি ভাবছি আমাদের এই অবস্থা হল কেমন করে । মনে হচ্ছে ভেবে পেয়েছি, বুঝলি?
এঁএঁহ, উনি সব বুঝে গেছেন, বুদ্ধির ঢেঁকি কোথাকার! ইঁদুরের লেজ গুনেই তো দিন যায়, কেলটুশ ফুট কাটে৷
এই ব্যাটা কেলেকুষ্টি, বুঝে কথা বল, ফুটফুটিও রোঁয়া ফোলায়৷ তোর ভবিষ্যৎ আমার এই — এই থাবার মধ্যে, তা জানিস? আমি সব আগের মতো করে দেব, তুই শুধু বল আমায় সাহায্য করবি কি না৷
করবই তো, করবই তো, আহ্লাদে লাফালাফি করতে থাকে আর পটাপট ল্যাজ নাড়ে কেলটুশ, কী করলে আবার পেটপুরে খেতে পাব বল, তাই করব৷ এই দ্যাখ তোর সঙ্গে থাবা মেলালাম৷
ফুটফুটি এবার গুছিয়ে বসে৷ দ্যাখ, ওয়াংমায়ের সোনার গুবরেটা চুরি হয়েছে তো বোঝাই যাচ্ছে৷ মনে আছে তোর, বড় হাঁড়িটা থেকে কেমন রকম—বেরকমের খাবার বেরোত? খেয়াল করেছিলি, রোজ ওয়াং —মা আলমারির খোপ থেকে গুবরেটাকে বের করে হাঁড়ির মধ্যে দিত? একদিন আমার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে নিজের মনে বলেওছিল, বুঝলি ফুটফুটি, এই জিনিসটি যে—সে নয়৷ এ হতেই আমাদের সব সৌভাগ্য৷ তারপর আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখেছিল জিনিসটা৷
কেলটুশের চোখ গোল গোল, কান খাড়া হয়ে ওঠে৷ 
আরে, তুই এসব আগে বলিসনি কেন? 
বুঝলে তো বলব রে বাপু৷ সেদিন ওই চু না মু কারা যেন এসেছিল মনে আছে? আমরা অনেক মাংসটাংস খেলুম? ফিরে যাওয়ার পরে ওই মেয়ে চু আবার এসেছিল, মনে পড়ছে? ওয়াং—মা আর মিংদাদা তখন মেলায় গিয়েছিল৷ আমি দেখেছিলাম, চু ওই খোপ থেকে কী একটা জিনিস বের করে নিচ্ছে৷ তখন বুঝিনি৷ এখন বুঝছি, ওই হাপিস করেছে জিনিসটা৷ আর এখন মিঞাবিবি মিলে আমাদের খাবারগুলো সাবাড় করছে৷ 
কী! চল ওদের দুটোকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে রেখে আসি, কেলটুশ দাঁতে দাঁত ঘষে৷
এই চোওপ! এসব কী কথা! ফুটফুটি এক ধমক দেয়৷ আমরা জিনিসটা ফেরত নেব, মিটে গেল৷ শুধুশুধু মারধোর, রক্তারক্তি — ওসব মানুষের কাজ, আমরা করি না, বুঝলি?

তাহলে কী করা যায় ? বুদ্ধি দে একটা৷ কেলটুশ মাথা চুলকোয়৷ 
চঃ, চু—দের বাড়ি গিয়ে গুবরেটা নিয়ে পালিয়ে আসি৷ ফুটফুটির কর্মপদ্ধতি খুব সংক্ষিপ্ত৷ 
দ্যুৎ, আমি  গিয়ে তো কোনো লাভই হবে না। কেলটুশ দুঃখী মুখ করে বলে, ওরা নিশ্চয় দরজা-জানালা এঁটেসেঁটে বন্ধ করে রেখেছে । তুই যেমন তরতর করে বাড়ির ছাদে উঠে যাবি, আমি তো তা পারবই না । কিছু কিছু জিনিসে বেড়ালদের সুবিধে দেখে হিংসে হয় সত্যি !
উফ, বোকাটা ! ফুটফুটি মাথা চাপড়ায়, আমি নাহয় দেওয়াল বেয়ে ঘরে ঢুকে জিনিসটা বের  করে আনলাম, কিন্তু আমায় ওবাড়ি অবধি নিয়ে যাবে কে? মাঝে একটা নদী পড়বে, সে খেয়াল আছে? তুই সাঁতার দিবি, আমি তোর পিঠে চড়ে থাকব, বুঝলি । রাস্তায় ঘাটে জন্তুজানোয়ার তেড়ে এলে তুই সামলাবি, আর জিনিসটা নিয়ে বেরিয়ে এলে একদম তৈরী হয়ে থাকবি বাইরে, আমরা শিগগির শিগগির পালিয়ে আসব। 

আর বলার যা অপেক্ষা, দুজনে মিলে রাতেই বেরিয়ে পড়ল । অনায়াসে নদী সাঁতরে পার হয়ে গেল কেলটুশ|  আঃ, কী ঠান্ডা জলটা! 
মনে হচ্ছে সেই ছোট্টবেলায় ফিরে গেছি রে, হাতপা ছুঁড়তে ছুঁড়তে বলল কেলটুশ । পিঠে বসে থাকা ফুটফুটি মাথা নাড়ল । চারদিকে কালো জল, মাথার ওপর এই এত্তবড় গোল চাঁদ, গোঁফের ওপর মিঠে হাওয়া - তার খুব ভালো লাগছিল । 
দুই বন্ধু যখন চু-দের বাড়ি পৌঁছল, তখন ঢং ঢং করে বারোটা বাজছে । বাড়ি অন্ধকার, সবাই গভীর ঘুমে ।
চুপটি করে এইখানে দাঁড়িয়ে থাক, কেল্টুশের কানে কানে বলে ফুটফুটি লাফিয়ে উঠল পাঁচিলে, সেখান থেকে আর এক লাফে বাগানে । একটা ঝোপের ছায়ায় বসে ভাবছে এবার কোন দিক দিয়ে ঢুকলে সুবিধে হবে, এমন সময়ে - 

কোথায় একটা খসখস আওয়াজ না? কান খাড়া হয়ে গেল ফুটফুটির । এক মুহূর্ত, তার পরেই অন্ধকারের মধ্যে নির্ভুল থাবা চালিয়ে একটা ইঁদুরকে পাকড়ে ফেলল সে । 
বেচারা আশপাশ ফাঁকা দেখে একটু হাওয়া খেতে গর্তের বাইরে বেরিয়েছিল ।
তবে রে হতভাগা, ইঁদুরটাকে ঝাঁকাচ্ছিল ফুটফুটি, নাম কী তোর?
ইঁদুরটার বয়েস কম, তাই সাহসটাও বেশি। ঘাবড়ে গিয়ে কেঁদেটেদে ফেলল না । বরং পরিষ্কার বেড়াল-ভাষাতেই বলল,  আমার নাম রতন এজ্ঞে। কাছেপিঠেই থাকি । ইয়ে, বলছিলুম কি, আপনার থাবাটা যদি একটু সরাতেন। মাইরি বলছি, আমি পালাব না । এই তিন সত্যি করলুম । 
ফুটফুটির খিদে পেয়েছিল ভালোই, ইচ্ছেও করছিল এই হতভাগা ইঁদুরকে এক থাবড়ে শেষ করে পেটটা ভরিয়ে নেয়, কিন্তু ইঁদুরের মুখে বেড়ালের ভাষা শুনে রতনকে তার অতটা খারাপ লাগছিল না । কিন্তু সেটা জানতে দিলে পাছে হতভাগা মাথায় চড়ে বসে, এই ভেবে সে আরেকটা ঝাঁকুনি দিল ইঁদুরটাকে । দাঁত খিঁচিয়ে বলল, এঁএহ, ইঁদুরের আবার তিন সত্যি! 
তা যা বলেচেন কত্তা, যা বলেচেন, জাতধম্ম বলে আমাদের তো আর কিচুই নেই। তবে কিনা, আমাদের ফেমিলি হল গে' কনফুসি বাবার বাড়ির ইঁদুরের বংশ, ও বাড়ির ইঁট-কাঠে জ্ঞান টুসটুস কচ্চে, তাতেই কিচু কিচু পেয়েচি। ওই যাকে বলে উত্তর-উত্তরাধি - যাকগে, অত খটোমটো মনে থাকেনাকো । মানে এই যে আপনি আমায় ছেড়ে দিলেন - বলে কী সব কসরত করে সে ফুটফুটির থাবার তলা থেকে সুরুৎ করে বেরিয়ে পড়ল - তাতেও কি আমি পালাব? মোটেই নয়কো । বরং এই যে আপনি আমার উবগারটা কল্লেন, তাতে আমি আপনার কেনা গোলাম হয়ে থাকব। বলে সে ভারি ভক্তিভরে দু'হাত জোড় করে ফুটফুটির সামনে বসল । 
 পালিয়ে দেখ না তুই! রোঁয়া ফোলাল ফুটফুটি । তার জিভ সুলসুল করছিল, কিন্তু সামলে নিল । এ ব্যাটাকে যদি কাজে লাগানো যায়, মন্দ কী?
অনেক তো বড় বড় কথা বললে চাঁদু, এবার ক'টা প্রশ্নের ঠিকঠাক জবাব দে দেখি । কোনো চালাকি না, মনে থাকবে ? রতন বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ল ।
এ বাড়ির লোকেরা কী খায় রে?  ভালোমন্দই খায় নিশ্চয়ই, নইলে তোর এরকম নাদুসনুদুস মূর্তি হয় কী করে? আমার মতো রোগাপটকা নোস কেন তুই?
রতন হেঁ হেঁ করে বলে, তা যদি বলেন কত্তা, আপনাদের আশীব্বাদে কদিন একটু ভালোমন্দ খাচ্ছি বটে । এবাড়ির লোকেরা পিঠেটা, পরোটাটা মাংসটা একটু বেশি খাচ্ছে আজকাল, তাই কুড়িয়ে বাড়িয়ে আমাদেরও জুটে যাচ্ছে আর কি । 
পিঠে? মাংস? পরোটা? বটে ! ফুটফুটি খেপে আগুন হয়ে যাচ্ছিল। তা বাড়ির তো এই হাল, এত খাবারের পয়সা আসে কোত্থেকে শুনি ?
তা আর বলব কী কত্তা, রতন কাছে ঘেঁষে এসে ফিসফিস করে বলে - কোত্থেকে কিসব মাদুলি না কি পেয়েছে -
পেয়েছে না ছাই, ফুটফুটি এবার ফেটে পড়ে, চুরি! চুরি করে এনেছে , বুঝলি ? আমাদের বাড়ি গিয়ে গাণ্ডেপিণ্ডে গিলে, তারপর টুক করে হাতিয়ে এনেছে জিনিসটা । আর আমরা এখন না খেয়ে মরি । উঃ , যদি পেতাম না হাতের সামনে, দাঁতে দাঁত ঘষল সে, চোখদুটো খুবলে নিতাম একেবারে !
ও বাবা, বুঝিচি, বুঝিচি! তাই ভাবি ওই সোনালী জিনিসটা এল কোত্থেকে ! জিজ্ঞেস তো আর করতে পারি না, তাই না কত্তা ?
জিজ্ঞেসের নিকুচি করেছে তোর, ফুটফুটি ল্যাজ আছড়ায়, কান পেতে শোন। ওই সোনার জিনিসটা আমাকে এনে দে, আমি তোকে একেবারে ছেড়ে দেব। কোথায় রাখে ওটা জানিস তো?
রতন বিগলিতভাব হাত কচলায়, আজ্ঞে কত্তা তা আর জানিনে, আপনাদের আশীব্বাদে আমাদের তো সব্বোত্তর গতি কিনা! রান্নাঘরের দেওয়ালে একটা ফাটামতো আছে, সেখানে গুঁজে রাখে দেখিচি। 
ভেরি গুড, গা ঝাড়া দেয় ফুটফুটি, শিগগিরি যা । অনেক দূর ফিরতে হবে আমাদের ।
রতন যেন আরও নুয়ে পড়ে । ইয়ে অপরাধ নেবেন না, কিন্তু ওই দব্যটা চলে গেলে আমাদের যে আবার খুদকুঁড়ো খেয়ে বেঁচে থাকতে হবে কত্তা?
চোওপ! চুরির জিনিসে ফুটানি মেরে আবার বড় বড় কথা ! ফুটফুটি হুঙ্কার দিয়ে ওঠে। যা বলছি। যদি এখুনি জিনিসটা এনে না দিস, তো তোরই একদিন, কি তোর কনফুসি বাবারই একদিন । জলদি, ওয়ান, টু -
 থ্রি বলার আগেই রতন চোঁ করে হাওয়া । মিনিট পাঁচেক পরে সে ফিরল হাঁপাতে হাঁপাতে, মুখে সোনালী গুবরে। কোনোমতে ফুটফুটিকে জিনিসটা ধরিয়েই সে আর দাঁড়াল না । বলা তো যায় না, বড়র পীরিতি বালির বাঁধ, কখন মন ঘুরে যায় ! কনফুসি বাবা আজ জোর বাঁচিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু  ফাঁড়া যে বার বার কাটবেই এমন কোনো কথা আছে? 

সোনালী গুবরেটাকে নিয়ে দুই বন্ধু যখন নদীর ধারে পৌঁছল তখন সবে ভোর হচ্ছে। চারিদিকে হালকা আলো, গাছে পাখি ডাকছে, ফুরফুর করে হাওয়া বইছে । রাত জেগে দুজনেরই চোখ জ্বালা করছে, কারুর শরীরই আর চলছে না । দুজনেই নদীর পাড়ে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিল । ফুটফুটি গুবরেটাকে ঘাসের ওপর রেখে দুপাশে দুই থাবা পেতে বসে ছিল, কেলটুশ  চেয়ে দেখছিল এদিক ওদিক । 
দেরি হয়ে যাচ্ছে যে, যাবি না? ফুটফুটি শুধোয় ।
কেলটুশ গা ঝেড়ে ওঠে । নদীর দিকে যেতে যেতে বলে, শোন, জিনিসটা কিন্তু সাবধানে রাখবি, ভুলেও ফেলে দিস না যেন । ওপারে যাওয়া অব্দি মুখ একদম কষে বন্ধ রাখবি, মেয়েমানুষ তো, সেইজন্যই বলা, মুখ বন্ধ রাখা ধাতে নেই কিনা ! 
কচুপোড়া! ভুরু নাচিয়ে গুবরে মুখে ফুটফুটি লাফিয়ে ওঠে কেল্টুশের পিঠে ।

কিন্তু কপালে বিপদ থাকলে খন্ডাবে কে? কেলটুশ সাঁতরে ওপারে পৌঁছে গেছে প্রায়, এমন সময় -
একটা মাছ জল থেকে লাফিয়ে উঠল । একেবারে ফুটফুটির নাকের সামনেই ।  এই এক হাত লম্বা মাছখানা, রুপোলী আঁশে রোদ ঝলকাচ্ছে । 
ফুটফুটির পেটের ভেতর খিদেটা চাগাড় দিয়ে উঠল । সে ভুলে গেল কেল্টুশের বারণ, সে ভুলে গেল সাবধান হতে, দিল হাওয়ায় এক কামড়, আর মুখ থেকে গুবরেটা খসে পড়ল জলে, তলিয়ে গেল মুহূর্তে ।
কেলটুশ হায় হায় করে ওঠে । গেল, গেল, সব গেল । তীরে এসে তরী ডুবল গো! সব এই হতচ্ছাড়া লুভিষ্টি বেড়ালের জন্য । এটার মাথায় কিচ্ছু নেই, স্রেফ ষাঁড়ের গোবর ।
ব্যাস, লেগে গেল দুমাদ্দুম ঝগড়া । দুজনেই রোঁয়া ফুলিয়ে ফ্যাঁশ করে তেড়ে যায়, দাঁত খিঁচোয়, এ ওকে গালাগালি দেয় । আর কী কী সব গালাগাল, বাবা রে বাবা। গাধা, ছাগল, এমন কি কচ্ছপ, খরগোশও । পরিস্থিতি এমনই ঘোরালো হয়ে উঠল যে শেষে একটা ব্যাঙ ছুটে এল।
আরে থামো থামো। শেষে কি মারপিট করে মরেই যাবে নাকি ! কী হয়েছে কী ?
দুজনে মিলে ক্যালরব্যালর করে যা বলল, তার থেকে সবটা বুঝে নিয়ে ব্যাঙ লাফ দিল জলে । এক দমে জলের তলায় পৌঁছে উদ্ধার করে এনে দিল সোনালী গুবরে ।
হারানিধি ফিরে পেয়ে দুই বন্ধু ঝগড়াঝাঁটি ভুলে গেল, গুবরে নিয়ে নাচতে নাচতে চলল বাড়ি ।

বাড়ি পৌঁছে দেখে, দরজা জানালা সব বন্ধ, ভেতরে কে যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে । কেলটুশ কত ঘেউ ঘেউ করে ডাকল, কেউ দরজা খুললই না ।
ওয়াং-মা খুব কষ্টে আছে, ফিসফিস করে বলল ফুটফুটি। দেখি যাই ভেতরে, কী করা যায় ।
বাড়ির একটা খোলা জানালা ছিল, সেটা দিয়ে লাফিয়ে ভেতরে ঢুকল ফুটফুটি । কেলটুশ বেচারি অত উঁচুতে লাফাতে পারবে না, তাই দাঁড়িয়ে রইল বাইরে। 
ভেতরে ঢুকে ফুটফুটি দেখে, মিং লি মড়ার মত বিছানায় শুয়ে, না খেয়ে খেয়ে শরীরে আর কিছু নেই । বুড়ি ওয়াং মেঝেয় বসে বুক চাপড়ে ইনিয়েবিনিয়ে কাঁদছেন । ফুটফুটি এক লাফ দিয়ে ওয়াংয়ের কোলে চড়ল । গুবরেটাকে ওয়াংয়ের কোলে ফেলে লুটোপুটি খেয়ে মুখ ঘষতে লাগল গায়ে।  এই দেখো মা, তোমার জিনিস আমি ফিরিয়ে এনেছি ।
জিনিস ফিরে পেয়ে ওয়াংয়ের আনন্দ আর ধরে না । আদর করে বেড়ালটাকে বুকে চেপে ধরলেন, তারপর হাঁচোড়পাঁচোড় করে উঠলেন রান্না করতে । ছেলেকে  টেনে তুললেন বিছানা থেকে । 
ওরে ওঠ ওঠ, আমাদের কপাল ফিরে গেছে, এবার আবার পেট ভরে খাব ।
উনুনে হাঁড়ি চড়তে দেরি হল না, খাবারও তৈরী হয়ে গেল চটপট । ওয়াং আর মিং লি পেট ভরে তো খেলই, ফুটফুটিও পেট ঠেসে ভালোমন্দ পেল । কিন্তু কেলটুশ বেচারি যে খিদে পেটে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, সে কথা কারুরই মনে রইল না । সে বেচারা খাবারের গন্ধ শোঁকে আর পায়চারি করে, আর অপেক্ষা করে কখন দরজা খুলে তাকে ঘরে ঢুকতে দেওয়া হবে । কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকাই  সার, কেউ তাকে খেতে ডাকল না ।
অনেকক্ষণ পরে জানালা গলে বেরোল ফুটফুটি । কেল্টুশের সামনে এসে থপ থপ করে হাঁটতে হাঁটতে বলল, আঃ, কী ভালোই না খেলাম । ওয়াং মা ভালোবেসে কত খাইয়েছে, কী বলি ! আমায় নিয়ে কী করবে ঠিক করতে পারছিল না । তোর খিদে পেয়েছে, না রে? তা দেখ যদি রাস্তায় কোথাও হাড়টাড় পাস, এ বাড়িতে তো তোর আর অন্ন জুটবে না মনে হয় ।
কেল্টুশের মাথায় আগুন ধরে গেল । তবে রে, পিঠে নিয়ে এতদূর গেলাম এলাম, আর নিজে পেট ঠেসে খেয়ে আমাকে খেদিয়ে দিচ্ছে? দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা। এক লাফে ফুটফুটির গলা টিপে ধরে তাকে একেবারে শেষ করে ফেলল সে । 


কেলটুশ আর বাড়িতে ঢুকল না । রাস্তায় বেরিয়ে বাকি সব কুকুরকে একজোট করে বলল, বেড়ালরা অকৃতজ্ঞ, উপকারীকে মনে রাখে না । কোনো কুকুর যেন কোনোদিন কোনো বেড়ালকে বিশ্বাস না করে।
সেদিন থেকে কুকুর আর বেড়াল একে অন্যের শত্রু। সেদিন থেকে কেল্টুশদের সমস্ত বংশধর, সে চীনদেশেই হোক কি অন্য কোথাও, ফুটফুটিদের নাতিনাতনিদের একমনে ঘেন্না করে। সেই থেকে কুকুররা বেড়ালদের একদম দেখতে পারে না । 










Monday, June 15, 2020

|| খেলা যখন ||

বিনোদমামু আমার বাবা নয়৷ বাবাকে আমার মনে পড়ে না৷ বাবা দেওয়ালে টাঙানো ছবি । রঙীন বা সাদাকালো । শোবার ঘর, বসার ঘর, সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে টাঙানো থাকে৷ মানে, থাকত ৷ বিনোদমামু আসার পর থেকে অনেকগুলোই সরে গেছে৷ সরিয়ে ফেলা হয়েছে৷

বিনোদ চ্যাটার্জি কবে প্রথম আমাদের বাড়িতে এসেছিল খেয়াল নেই । আমাদের বাড়ি মানে, দাদুর বাড়ি । বাবা মারা যাওয়ার পর মা আমাকে নিয়ে এখানেই ফিরে এসেছিল। আমার আবছা মনে পড়ে, মা তখন সারাদিন কাঁদত। চুল আঁচড়াত না, জামাকাপড় পালটাত না, ভালো করে খেত না। এমনকি আমাকেও কাছে ডাকত না । আমাকে আগলে রাখত মানদাদিদি। দাদু অস্থির হয়ে মায়ের ঘরের বাইরের বারান্দায় পায়চারি করতেন। মাঝরাতেও বারান্দা থেকে তাঁর চটির আওয়াজ পেতাম। 

একটু একটু মনে আছে, তখন লোয়ার নার্সারিতে পড়ি, তখন মাঝেমধ্যেই স্কুল থেকে ফিরে দেখতাম বসার ঘরের সোফায় একটা রোগামতো লোক বসে৷ উসকোখুসকো চুল, গায়ে একটা দোমড়ানো পাঞ্জাবি৷ বেশি কথা বলত না, সামনে চায়ের কাপ নিয়ে বসে থাকত ঘন্টার পর ঘন্টা৷ মা উলটোদিকের কাঠের চেয়ারে, মাঝেমধ্যে কথা বলত দুটো একটা৷ 

তারপর কবে থেকে যেন মা একটু একটু করে উঠে বসল, খাবার টেবিলে এসে বসল সকালবিকেল, সাদা জামাকাপড়ের ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে পরতে লাগল হালকা নীল গোলাপি বেগুনি। আমাকে খাইয়ে দিত মাঝে মাঝে, চুল আঁচড়ে ক্লিপ লাগিয়ে দিত, হোমওয়ার্ক করার সময়ে এসে বসল পাশে।  আমি একটু একটু করে টের পাচ্ছিলাম, মা একটু বেশি বেশি হাসছে, রাতে বালিশে মুখ গুঁজে অত কাঁদছে না যখনতখন৷ আমি ওদের কথার মধ্যে গিয়ে হুটোপুটি জুড়তাম, মা কোলে বসিয়ে গালে গাল রাখত৷ লোকটা কোলে নিত না বটে, তবে কাছে গেলে মাথায় বিলি কেটে দিত মাঝেমধ্যে৷ মা—ই ডাকতে শিখিয়েছিল, বিনোদমামু৷ কিন্তু আমি ওকে ওই নামে ডাকতাম না ৷

দাদু মা-কে সঙ্গে করে তাঁর আপিসে নিয়ে যেতে লাগলেন, আর আমি দেখতে পেলাম আস্তে আস্তে কেমন পাল্টে যাচ্ছে মা। কেমন চকচকে, ধারালো হয়ে উঠছে, শক্ত করে পা ফেলছে মেঝেয়, গলা চড়িয়ে বকছে মানদাদিদিকে, কড়া নজর রাখছে আমার পড়াশোনায়। তারপর দাদু মারা গেলেন আর মা আরও বেশি বেশি সময় দাদুর আপিসে কাটাতে শুরু করল। 

একদিন বিকেলে মহুয়ামাসি এল৷ মায়ের ইশকুলের বন্ধু মহুয়ামাসি৷ আমি ইশকুল থেকে ফিরে টেবিলে বসে চাউমিন খাচ্ছিলাম, মা আর মহুয়ামাসি কথা বলছিল ঘরের অন্য প্রান্তে সোফায় বসে৷ মা মাঝে মাঝে চোখ মুছছিল আর মায়ের পিঠে হাত বোলাচ্ছিল মহুয়ামাসি৷ 
এইটেই সবচেয়ে ভালো হবে বিনি, তুই মন ঠিক কর৷ আমি শুনতে পেলাম৷ আমার মায়ের নাম বিনীতা৷
এর সপ্তাহখানেকের মধ্যে মায়ের সঙ্গে ওই লোকটার বিয়ে হয়ে যায়৷ একদিন সন্ধেবেলা মা আমাকে ভালো ফ্রক পরিয়ে দিল একটা, নিজে একটা জরিপাড় হলুদ শাড়ি পরল৷ অনেকদিন পর ভালো করে চুল আঁচড়ে খোঁপা বাঁধল, কাজল পরল, টিপও৷ ঠোঁটে লিপগ্লস লাগাল অল্প৷ তারপর আমার হাত ধরে নেমে এল নীচে৷ 
বসার ঘরে তখন আট—দশ জন লোক৷ মহুয়ামাসি আর মেসো তো আছেই, আছেন ফোলিও ব্যাগ হাতে এক ভদ্রলোক, আরও কারা কারা যেন৷ সোফার এককোণে জড়োসড়ো হয়ে, মুখে একটা ভ্যাবলাটে হাসি ঝুলিয়ে বসে আছে লোকটা, যাকে মা বিনোদমামু ডাকতে শিখিয়েছে৷ মানদাদিদি সকলকে চা দিচ্ছে৷ মহুয়ামাসি মায়ের খোঁপায় একটা জুঁইয়ের মালা জড়িয়ে দিল৷ 
সেদিন সন্ধেতেই মা আর ওই লোকটার সই করে বিয়ে হয়ে গেল৷ আর বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে আমাদের বাড়িতেই থাকতে এল বিনোদমামু৷ আমি ওকে কোনোদিন বাবা বলে ডাকিনি ৷

বিনোদ চ্যাটার্জি ছবি আঁকত। কোনো একটা কলেজে আঁকা শেখাতও। ওর জিনিসপত্রের মধ্যে তাই অল্প কয়েকটা জামাকাপড় ছিল, আর বেশিটাই ছবি আঁকার সরঞ্জাম। ইজেল, তুলি, নানারকম রং। সেসব নিয়ে লোকটা আমাদের পাশের ঘরে এসে ঢুকল। 
আমি তখনও মায়ের ঘরেই শুই, মায়ের দাদুর আমলের বড় খাটে, মায়ের পাশে। রাতে মায়ের হাত আমাকে ছুঁয়ে  থাকে, আমি মায়ের নিঃশ্বাসের শব্দ পাই। ওই লোকটা পাশের ঘরে আসার পর থেকে টের পেতাম, মায়ের নিঃশ্বাস কেমন অস্থির অস্থির, হাত একবার বিছানায় নামে, একবার বালিশে। মা রাতে না ঘুমিয়ে ছটফট করে ।

আমি বড় হচ্ছিলাম। মা যতই আমাকে আগলে রাখুক, স্কুলে বন্ধুরা আমাকে রেহাই দিত না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করত নতুন বাবা আমাদের বাড়িতেই থাকে কিনা। 
- বাবা না, বিনোদমামু হয়। আমি বলেছিলাম। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েছিল অঙ্কিতা, সুদেষ্ণা, সোমাশ্রী। 
- তা বিনোদমামু থাকে কোথায়? তোদের সঙ্গেই নাকি? কপালের চুলগুলো সরাতে সরাতে জিজ্ঞেস করেছিল অঙ্কিতা।
- থাকে তো । মানে আমি মায়ের সঙ্গে থাকি, ও তো পাশের ঘরে ঘুমোয়। 
হি হি হি হি হি - সবকটা মেয়ে এ ওর গায়ে হেসে গড়িয়ে পড়তে থাকে। আমি কিছু বুঝি না। কিন্তু আমার মাথার মধ্যে কিছু একটা বাজতে থাকে। আমি খেয়াল করতে থাকি, মায়ের যেদিন অফিস থেকে ফিরতে দেরি হয়, সেই দিনগুলোতেই বিনোদমামুও সন্ধে পার করে কলেজ থেকে ফেরে। মা গাড়িতে, ওই লোকটা হয়তো বাসে, হয়তো বা ট্যাক্সিতে। সেই দিনগুলোতে মায়ের মুখটা কেমন ঝকঝক করে, আমাকে আদর করে বেশি বেশি, পড়া  নিয়ে খিটখিট করে না একদম।
আর রাতে একদম নিশ্চিন্তে ঘুমোয়। 

আমি বুঝতে পারছিলাম মা একটু একটু করে দূরে সরছে, সবসময় আমাকে নিয়ে পড়ে থাকছে না। শুধু আমাকেই আর ভালোবাসছে না। 
কারণ মা এখন ওই লোকটাকেও ভালোবাসে।
আমি বিনোদমামুকে ঘেন্না করতে শুরু করলাম। 
মা বুঝতে পারল না। মানদাদিদি বোধ হয় বুঝেছিল। স্কুল থেকে ফিরলে আমাকে খেতে দিয়ে নিজের মনে গজগজ করত, এত বড় মেয়েকে ফেলে - এদের কোনো লজ্জা আছে, ছি ছি। আমি চুপ করে শুনতাম। আমার খারাপ লাগত না।

একদিন স্কুল থেকে ফিরলাম প্রচন্ড গা ম্যাজম্যাজ আর পেটব্যথা নিয়ে। শরীরে কী যেন একটা অস্বস্তি। বাথরুমে গিয়ে দেখি, প্যান্টিতে থকথকে বাদামী তরল। কমোড লাল হয়ে গেল রক্তে। 
আমি তখন ভয়ে আধমরা। আমার প্রচন্ড অসুখ করেছে, নিশ্চয়ই। এবার আমি একদম মরে যাব। 
কাঁদতে কাঁদতে বাথরুম থেকে বেরোলাম। মানদাদিদি রান্নাঘরে আছে, কিন্তু আমার মা-কে চাই। 
ফোঁপাতে ফোঁপাতে আমাদের শোবার ঘর পার করে কখন ওই লোকটার ঘরে ঢুকে পড়েছি খেয়াল করিনি। এমন কি, লোকটা যে বাড়িতে আছে তাই জানতাম না। শেষে মাটিতে ছড়ানো একগাদা রং-তুলির উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে খেয়াল হল ।
লোকটা কিন্তু ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল। কী হয়েছে, রিনটিন? কী হল? 
একেবারে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললাম। মা-কে ডাকো । রক্ত। আমি মরে যাব । 
লোকটা একটু থমকে গেলেও সামলে নিল তাড়াতাড়ি। হয়তো কিছু একটা আন্দাজ করেছিলই, আমাকে যত্ন করে চেয়ারে বসাল| নিজে বসল আমার সামনে মাটিতে হাঁটু গেড়ে। 
দ্যাখো রিনটিন, তোমার মা থাকলে সুবিধে হত । এখন আমি তোমায় কী করে কী বলি ! মেয়েদের এরকম হয়, প্রতি মাসেই হয় । ভয় পেয়ো না। এসো আমার সঙ্গে, তোমার মায়ের আলমারিতে দেখি কিছু জিনিসপত্র পাওয়া যায় কিনা ।
আমার পায়ে ছোপ ছোপ লাল-নীল রং। আমার স্কার্টে রক্তের দাগ। আমি বড় হয়ে গেছিলাম । লোকটাকে আমার ততটাও খারাপ লাগছিল না । 

ব্যথা কমলে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘন্টাখানেক পর ঘুমটা খানিক পাতলা হয়ে এল । খুটখুট আওয়াজ । হালকা পারফিউমের গন্ধ । মা ফিরল । হাতের ব্যাগটা রাখল টেবিলে । আলোটা জ্বালতে যাবে, ওপাশের দরজা থেকে একটা হালকা গলাখাঁকারি শোনা গেল। 
-একবার এদিকে শুনে যাও, বিনি। এই প্রথম লোকটাকে মায়ের ডাকনাম ধরে ডাকতে শুনলাম । এর আগে পুরো নামেই ডাকতে শুনেছি, খাবার টেবিলে, বারান্দায়। 
মা পাশের ঘরে গেছে । কথা বলছে ওরা। আমি কান খাড়া করে শুয়ে থাকি । আমার নামটা কয়েকবার বলা হচ্ছে শুনতে পাই । দুটো গলা কাছে এগিয়ে আসে । দরজায় দাঁড়ায় । 
থ্যাঙ্ক ইউ, বিনু। খসখসে গলায় বলছে মা । চোখ বুজেও আমি বুঝতে পারি, মায়ের একটা হাত বিনোদমামুর হাতের মধ্যে । 
লোকটাকে কেমন ঘেন্না হয় আমার । সেদিন রাতে শরীরখারাপের ছুতো দেখিয়ে খেতে উঠি না ।

দিনকয়েক পর দেখি আমাদের সবার ঘরের পাশের ছোট ঘরটা ঝাড়পোঁছ হচ্ছে। এই ঘরটায় দাদু মাঝেমধ্যে অফিসের কাজ সারতেন। একটা টেবিল-চেয়ার ছিল ও ঘরে, ঘরের মাঝখানে একটা আরামকেদারা। 
বিকেলে এসে দেখলাম ও ঘরে একটা খাট ঢোকানো হয়েছে আর আরামকেদারা সরে গেছে দেওয়ালের দিকে । টেবিলে আমার বইপত্র সাজানো, বিছানায় আমার পছন্দের জয়পুরি চাদর । জানালায় বাহারি পর্দা ।
এখন থেকে এটা তোমার ঘর । বড় হচ্ছ, তোমার একটা আলাদা ঘর দরকার এবার । মা বলল অফিস থেকে ফিরে । আজ থেকে এখানেই শুয়ো । আমি তো রইলামই পাশের ঘরে ।
সেদিন রাতে ঘরের দরজা বন্ধ করলাম না অন্ধকারে ভয় লাগে বলে । সারারাত ঘুম এল না ভাল। কে জানে কীসের জন্য কান খাড়া রইল। সারারাত পাশের ঘরে একটানা ফ্যানের আওয়াজ শুনলাম। 


অঙ্কিতা, সুদেষ্ণা, সোমাশ্রীরা এখন আরও বেশি হাসাহাসি করে। কী রে, এতদিনে কিচ্ছু দেখিসনি? সত্যি? আমিও ওদের সঙ্গে হাসাহাসি করি । স্কুলবাসে অঙ্কিতার মোবাইলে লুকিয়ে সবাই মিলে দেখা হয় ভিডিও । অবশ্যই মিউট করে । মা বলেছে আরও দুবছর পরে আমি মোবাইল পাব। বাড়ির ডেস্কটপ থেকে ফেসবুক করি মাঝে মাঝে । মা বলেছে ওটা প্রজেক্টের কাজের জন্য । 

সেদিন বেলা বারোটা নাগাদ হঠাৎ তুমুল বৃষ্টি নেমেছিল । রাস্তায় প্রায় জল জমে যায় দেখে স্কুল ছুটি দিয়ে দেওয়া হল । অনন্য আমাদের বাড়ির কাছাকাছিই থাকে, ওর মা আমাকেও ওদের গাড়িতে তুলে বাড়িতে ছেড়ে দিলেন । 
বাড়িতে ঢোকার মুখে প্রাণভরে ভিজলাম খানিক । তারপর চাবি ঘুরিয়ে ভিতরে ঢুকলাম । মানদাদিদির আজকাল নিচে নামতে অসুবিধে বলে সদর দরজার একটা চাবি আমার কাছেই থাকে আজকাল। জুতোমোজা ভিজে গেছে, সেসব ছেড়ে ভিজে পায়ে ছপছপ করে উঠলাম দোতলায় ।
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে । বারান্দায় টবের গাছগুলো আনন্দে ভিজছে । মানদাদিদি কোথায় কে জানে । বাড়িটা কেমন অস্বাভাবিক নিঝুম, নিঃশব্দ ।

না, নিঃশব্দ নয় । কারণ মায়ের পাশের ঘরটা থেকে কিছু আবছা আওয়াজ আসছে । আওয়াজটা চেনা চেনা কি? কোথায় শুনেছি এ শব্দ? কোথাও শুনেছি কি ?
সব শব্দ ডুবে গেছে । বৃষ্টির শব্দ শুনতে পাচ্ছি না আমি । পায়ে পায়ে হেঁটে যাচ্ছি ওই ঘরের দিকে । ঘরের দরজা বন্ধ । জানালার উপরের পাল্লাটায় সামান্য ফাঁক । সেখান দিয়ে আসছে ওই শব্দটা । 
আমি শব্দটা চিনেছি । ওই শব্দ মিউট করেই আমরা লুকোনো মোবাইলে ভিডিও দেখি । 
আমি থামতে পারছি না। এগিয়ে যাচ্ছি, চোখ রাখছি জানালায় । আর দেখছি সেই দৃশ্য যা আমার কখনও দেখা উচিত ছিল না।
মা বিছানায়, নীচে। উপরে ওই লোকটা । জানালার ফাঁক দিয়ে অল্প আলো পড়েছে ওদের গায়ের চামড়ায় । কারণ চামড়ার ওপর কিছু নেই আর । দুটো শরীর উঠছে নামছে, ঘাম চিকচিক করছে দুজনের মুখে । বিনোদ আর বিনীতা । দুজনের গলা থেকেই চূড়ান্ত সুখের সব শব্দ ছড়িয়ে যাচ্ছে ঘরে । মায়ের মুখে কী এক আনন্দ মাখামাখি হয়ে আছে , সেরকম আমি কোনোদিন দেখিনি। আমি ভালো রেজাল্ট করলে নয়, স্পোর্টসে প্রাইজ পেলে নয়, অফিস থেকে ফিরে আমাকে দেখতে পেলেও নয় । এই মাকে আমি চিনি না । 

কতক্ষণ কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না । হয়তো অজান্তে একটু আওয়াজ করে ফেলেছিলাম । ঝপ করে মুখ তুলল লোকটা । জানালা থেকে পালিয়ে যেতে যেতেও মনে হল, লোকটার চোখদুটো কী সুন্দর ! 
নিজের ঘরে ঢুকে ভিজে জামাকাপড়েই আছড়ে পড়লাম বিছানায় ।  দরজায় ছিটকিনি দিয়ে । অবাধ্য হাত আপনিই নেমে গেল দু পায়ের ফাঁকে । 

বৃষ্টিতে ভেজার জন্যই কি না জানি না, তুমুল জ্বর এসে গেল সন্ধেয় । সারারাত ছটফট করতে করতে টের পেলাম, খাটের পাশে ঠায় বসে আছে মা । 
জ্বরটা পরদিন ছাড়ল না, তার পরের দিনও না । হাতপা-য় ভয়ানক ব্যথা, বিছানা থেকে উঠতে গেলেই মাথা টলে যায়। এই দুদিন মা অফিস গেল না। মাথায় আইসব্যাগ দিল, খাবার এনে দিল ঘরে । দুদিন পরে ঘর ছেড়ে বাইরে এসে দেখলাম, মায়ের পাশের ঘরটা ফাঁকা । জানলাম, বিনোদমামু জিনিসপত্র নিয়ে ছাতের ঘরে উঠে গেছে । 
কেন? আমি জিজ্ঞেস করি । মুখটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে । 
সামনে ওর এক্সিবিশন আছে। একমনে ছবি আঁকবে । তাই।  মায়ের ঠোঁটের কোণদুটো কাঁপছিল ।

এর পর থেকে বিনোদমামু কমই নামত নীচে। ওই খাওয়ার সময়টুকুই যা, তাও মাঝে মাঝে দেখতাম নিজের থালাটা নিয়ে উঠে যাচ্ছে ওপরে । বা হয়তো খেতে আসছেই না । 
মায়ের চুল একটা দুটো করে সাদা হচ্ছিল, মুখের চামড়া কুঁচকে যাচ্ছিল তাড়াতাড়ি । ওই লোকটারও মাথাভর্তি নুন-মরিচ চুল । 
মায়ের সঙ্গে কথা ক্রমশঃ কমে আসছিল আমার । অথচ ওই লোকটা সামনে এলেই মায়ের মুখে আলো জ্বলে উঠত। লোকটার দিকে তাকিয়ে  দেখতাম তখন । লোকটাকে বেশ ভালো দেখতে, এখনও । 

স্কুলের শেষ বছর এটা । বাড়িতে থাকারও হয়তো। কারণ আমি দূরের কলেজে পড়তে যেতে চাই । ইন্টারনেটে দেখছি । মা-কে বলিনি। মা শুধু জানে আমি খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করছি । টিউশন, পরীক্ষা, কেরিয়ার ।  
অঙ্কিতা, সুদেষ্ণা, সোমাশ্রীদের হোয়াটস্যাপ করি মাঝে মাঝে । মা একটা মাঝামাঝি ধরণের মোবাইল দিয়েছে আমায় । ক্যামেরাটা ভালো, কিন্তু বেশিক্ষণ গেম খেলার চেষ্টা করলে স্লো হয়ে যায় । ইউটিউব ভিডিও আটকে যায় মাঝে মাঝে । কলেজে উঠে টিউশনি করে টাকা জমিয়ে আমি একটা ভালো মোবাইল কিনব । 
টুকটাক ফেসবুক করি । মাঝেমধ্যে মেসেঞ্জার টিং করে ওঠে । হাই। তোমার বন্ধু হতে চাই । কী সুন্দর দেখতে তোমায় । পাত্তা দিই না । ব্লক করি যেভাবে বইয়ের ফাঁকে পাওয়া চিঠি কুচিকুচি করি একাগ্র নিষ্ঠুরতায় । এদের আমি চাই না । আমি কী চাই, আমি তা জানি । 

আজ দোল। এমনিতে আমাদের বাড়িতে দোল খেলার চল নেই । বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দোল খেলি, মা খুব একটা পছন্দও করে না। ভূত সাজতে আমারও যে ভাল লাগে এমন নয় । ওই নিয়মরক্ষা ছোট্ট এক প্যাকেট আবির আসে, মা দুটো টিপ দেয় আমার গালে আর কপালে । মায়ের গায়ে কোথাও আবির দেওয়া মা পছন্দ করে না । ওই গুঁড়ো রং তুলে ফেলে বারান্দায় বসে দেখি, রাস্তায় হুল্লোড় লাগিয়েছে পাড়ার বাচ্চাগুলো । লালনীল বাঁদুরে রঙে সব মুখগুলো কালো, জামা সপসপে ভিজে । আনন্দের চিলচিৎকারে কানে তালা ধরে যায় । অবশেষে সাড়ে বারোটা একটা নাগাদ মায়েরা এসে সবকটার নড়া ধরে বাড়ি নিয়ে যান । আমরা তখন খেতে বসি। মানদাদিদি সেদিন স্পেশাল পোলাও আর চিকেন রান্না করে ।  

এবারের দোল অবশ্য আলাদা । সন্ধে নাগাদ বসন্ত উৎসবের প্ল্যান হয়েছে ছোট্টমত। মানে ওই হলুদ শাড়িটাড়ি, মাথায় ফুল, নানারকম গয়না । নীচের বড়ঘরে খানিক আবির, গানবাজনা। বন্ধুদেরই প্ল্যান এসব, আমি হলে ঝুটঝামেলায় যেতাম না । 
স্কুলের শেষ বছর বলেই মা হয়তো কিছু বলেনি।  শাড়ি বের করে দিয়েছে, একটা ইমিটেশন মুক্তোর সেটও । কাজল লিপস্টিক মায়ের ড্রেসিংটেবিলে থাকে, আমি জানি । 

দুপুর নাগাদ মা একটু অফিসে বেরোল । কী ফাইল নাকি ফেলে এসেছে , কয়েক ঘণ্টাতেই চলে আসবে ।  
আমি আর মানদাদিদি বাইরের ঘরটা একটু ঝাড়াঝুড়ি করলাম। সোফাগুলো ঠেলে দিলাম পিছনে, সেন্টার টেবিলটা সরালাম, খুঁজেপেতে গোটা দুই শতরঞ্চি এনে পেতে দিলাম মেঝেয় । এই সব করে দেখি চারটে বেজেছে । 
বন্ধুরা ছটা নাগাদ আসবে বলেছে ।  মানদাদিদি চা এনে দিল, চা খেয়ে সাজুগুজু করতে যাব। 
সোফায় বসে কাপটা সবে ঠোঁটে তুলেছি, কে যেন ঘরে ঢুকল । মানদাদিদির দিকে তাকিয়ে বলল, ইয়ে, একটু পুরোনো ন্যাকড়া যদি - 
আমার দিকে নজর পড়তে একটু হাসির মতো করে বলল, ওঃ, তুমি । কেমন আছো, রিনটিন ? 
আমার চুল মাথার ওপর একটা ঝুঁটি করে বাঁধা, মুখে হালকা ধুলো । লোকটার পাঞ্জাবিতে ইতিউতি রঙের ছোপ, গালেও একটু রং লেগেছে । মনে পড়ল, আজ দোল । 
আমার সর্বনাশ হয়ে গেল। 

শাড়ি আমি নিজেই পরতে পারি, কুঁচিটা ধরে দিল মানদাদিদি । আঁচলে সেফটিপিন লাগালাম, মায়ের রেখে যাওয়া গয়নাগাটি পরে নিলাম যন্ত্রের মতো। কাজল লাগালাম ঘন করে। খয়েরি লিপস্টিক। চুলটা আঁচড়িয়ে খুলে রাখলাম ।
এ বছরের আবিরের প্যাকেটটা কোথায় রাখা আছে আমি জানি ।  সামান্যই ব্যবহার হয়েছে । গাঢ় লাল রঙের গুঁড়ো হাতে নিয়ে আমি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম । 
বাইরের আলো তখন মরে আসছে । আমি গিয়ে দরজায় দাঁড়ালাম । ইজেলে একটা ছবি । ঘরের কোণে কতগুলো গোটানো ক্যানভাস । ঘরের মেঝেয় ছবি আঁকার সরঞ্জাম । লোকটা ইজেলের সামনে একটা টুলে বসা । পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকাল । 
রং দিতে এলাম, বললাম আমি ।  


লোকটা নড়ল না । শাড়ির খসখস শব্দ তুলে হেঁটে গিয়ে আমি ওর সামনে হাঁটু মুড়ে বসলাম মেঝেয় । কিছু বোঝার আগেই এক খাবলা লাল রং মাখিয়ে দিলাম গালে । 
আমাকে রং দাও । প্লিজ । ওর হাঁটুর উপর দু'হাত রেখেছি আমি । ওর নুন-মরিচ চুল, ওর ঝকঝকে চোখ এখন আমার খুব কাছে । খুব । বিপদঘন্টি টের পাচ্ছি আমি। ঢং, ঢং, ঢং ...

নীচে যাও, রিনটিন । গম্ভীর গলায় আদেশ এল । পাগলামো কোরো না । যা-ও । 
আমি আর পারলাম না । কাঁদতে কাঁদতে মুখ ঘষছি ওর কোলে। ধুয়ে যাচ্ছে কাজল, লিপস্টিক লেগে যাচ্ছে পাঞ্জাবিতে । আমাকে ফিরিয়ো না । একবার , একবার ....
কথা শোনো রিনটিন, নীচে যাও । এরকম করতে নেই, লক্ষ্মী তো । লোকটা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে । সে হাতে স্নেহ ছাড়া কিচ্ছু নেই, টের পাই । কেন নেই? 
ফলে আমি আরও কাঁদতে থাকি । খিমচে ধরি পাঞ্জাবির কোণা । আমার চুল এলোমেলো হয়ে যায় । একবার, একবার .......
হাতদুটো এবার জোর করেই আমাকে সোজা করে দেয় । রিনটিন , তুমি কী বলছ তুমি জানো? 
জানি, জানি, জানি । সেই বৃষ্টির দুপুর থেকেই ...
রিনটিন, আমি তোমার বাবা হই !
কিন্তু আমি তোমার মেয়ে নই, বলে দু'হাত বাড়িয়ে সেই নুন-মরিচ চুল আঁকড়ে ধরি আমি। ঠোঁট চেপে ধরি ঠোঁটে । বাকি সবটুকু আবির ছড়িয়ে যায় আমার শাড়িতে ।

পরক্ষণেই একটা প্রচণ্ড ধাক্কা আমাকে ছিটকে ফেলে দেয় । একটা ছোট টেবিলে কপালটা ঠুকে যায়, কীসে যেন খোঁচা লাগে ব্লাউজের হাতায় । ফ্যাঁস করে ছিঁড়ে যায় সেটা । 
কোনোরকমে উঠে দাঁড়াতেই একটা চড় এসে পড়ে গালে । সঙ্গে একটা কঠিন ঠাণ্ডা স্বর । 
বেরিয়ে যাও, রিনটিন । আর কোনোদিন এখানে এসো না । 

মানদাদিদি হয়তো আওয়াজটাওয়াজ শুনেই সিঁড়ির মুখে এসে থাকবে ।  আমাকে আলুথালুভাবে নামতে দেখে চিৎকার করে উঠল । বন্ধুরা কয়েকজনও এসে গিয়েছিল ততক্ষণে । 
সিঁড়ির নিচের ধাপে বসে পড়লাম আমি । আমার চুল এলোমেলো, কাজল লেপ্টে গেছে, শাড়িময় আবির। ব্লাউজের এক কোণ ছেঁড়া । সুদেষ্ণা আমাকে জড়িয়ে ধরল । ধীমান আর অভিজ্ঞান দৌড়োল ওপরে ।
মাথাটা বোঁ করে ঘুরে উঠল । তারপর আর কিছু মনে নেই । 

চোখ খুলে দেখি নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে আছি । টেবিলল্যাম্পটা জ্বলছে । আমার গায়ে বাড়িতে পরার জামা, শাড়িটা চেয়ারে জড়ো করা। চুলগুলো খানিক ভিজে। কেউ জল ঢেলেছিল ?
দোতলায় কোথাও কোনো শব্দ নেই । মায়ের ঘরে আলো নেভানো । বারান্দায় একটা বাল্ব জ্বলছে টিমটিম করে । 
একতলায় যাওয়ার সিঁড়ির দিকে এগোই । অনেক মানুষের চাপা স্বর শোনা যাচ্ছে । এত লোক কোথা থেকে এল? 
বসার ঘরে অনেক লোক । সুদেষ্ণা, অঙ্কিতা, অভিজ্ঞান । সুদেষ্ণার মা এসেছেন । ধীমানের বাবাও । আরও কিছু লোক এদিক ওদিক ছড়িয়ে। এদের অনেককে আমি চিনি না । একটা সোফার ওপর দুমড়েমুচড়ে বসে আছে মা । চুল উস্কোখুস্কো, মুখচোখ ফোলা । মা কি কান্নাকাটি করেছে ? মায়ের পাশে মহুয়ামাসি । 
ওদিকের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে আছে মানদাদিদি । আর তার থেকে একটু দূরে, মেঝেয় শোয়ানো একটা বস্তু। চাদরঢাকা । চাদরের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে পাঞ্জাবির কোণা । 
ও পাঞ্জাবি আমি চিনি । আজ বিকেলে ওই পাঞ্জাবি আঁকড়েই আমি - 
এসব কী হল ? কী করে হল? 

আবার বোধ হয় মাথাটা ঘুরে গেছিল । সুদেষ্ণার মা ধরে ফেললেন । 
কী কপাল বল তো । তোর - মানে বিনোদ যে এরকম করে বসবে কে জানত ! ছাদের ঘরে হঠাৎ ফ্যান থেকে -
তিনি আমাকে একটা চেয়ারে বসান । হাতে ধরিয়ে দেন জলের গেলাস । ভয়ে আমার বুকের ভিতরটা হিম হয়ে যায় । আমি হেঁচকি তুলে কাঁদতে থাকি । ঘরের সবাই আমার দিকে মুখ তুলে তাকায় । সুদেষ্ণার মা আমার পিঠে হাত বুলোচ্ছেন ।  'পুলিশ' শব্দটা শুনতে পাই কয়েকবার । 
আমি চোখ তুলি। একজোড়া চোখের সঙ্গে চোখাচোখি হয় । কেঁদে কেঁদে লাল হয়ে যাওয়া দুটো চোখ । সে চাউনিতে স্নেহ নেই, ভালোবাসাও নয় । সে চোখে শুধু ঘেন্না। রাগ। অপমান। প্রতিশোধ ।

ও মা নয়। বিনীতা নয় । ও আমার  বাবার স্ত্রী ।  ও সব জানে । সব বুঝেছে । ও আমাকে ছাড়বে না ।



























Wednesday, May 6, 2020

।। উপায় ।।


মরে যা, মরে যা শালি - একটা জড়ানো গলা। লাথি পড়ছে বন্ধ দরজায় । খোল রেন্ডি , দরজা খোল -

আঁ আঁ আঁ । জন্তুর মতো গোঙানি। ঘরের অন্ধকার কোণে একটা পুঁটলিপাকানো অবয়ব । দরজায় ধাক্কা পড়লেই ভয় পায় আর মা-কে ডাকে ।

আরতি চেষ্টা করেছিল । ওকে নিয়ে কাজে যাবার । হয়নি । কাজের বাড়ির সিঁড়ি ভেজানো যদি বা তারা মেনে নিয়েছিল, তাদের বাড়ির বাচ্চাকে খিমচে দেওয়াটা সহ্য করেনি । তা ছাড়া রেখে গেলে পাড়ার বাচ্চাগুলো পিছনে লাগত । কাজটা রাখা যায়নি ।

সেই থেকে নিমাইয়ের উপর নির্ভর । তার কাজ থাকে আর যায় । থাকলে, মাইনেটা প্রায় মদের দোকানেই যায় । বাড়িতে দুটো মানুষ আধপেটা খেয়ে বা না খেয়ে থাকে । নিমাই এসে খিস্তি করে দুজনকেই । মরে যা, মরে যা বাঞ্চোৎ । বারান্দা ভাসিয়ে বমি করে । পুঁটলিটাকে লাথি মারতে যায় ।

আগে ছিল না এমন। বিয়ের পরপরই আদর, সোহাগ, সশব্দ ভালোবাসাবাসি। তারপর ওই অবয়ব। আঁ আঁ আঁ । নিমাই অচেনা মানুষ হয়ে গেল ।

নিজের সন্তানের মরণকামনা করো তুমি ! থাকতে না পেরে একদিন বলেছিল আরতি ।
স-ন-তা-ন! কে আমার চোদ্দপুরুষের সন্তান রে ! খিঁচিয়ে উঠেছিল নিমাই। কোন নাঙ এসে পেট করে দিয়ে গেছে -

এক লাথিতে দরজাটা ভেঙে গেল । দুপাশ থেকে দুটো গলা । একটা ক্রুদ্ধ, একটা ভীত সন্ত্রস্ত অসহায়।

শা-লি !
আঁ আঁ আঁ ।

আরতি চোখ বন্ধ করে একটা ধাক্কা দিল । সামান্য আর্তনাদ, একটা শরীর দেওয়ালে মাথা ঠুকে মেঝেয় পড়ল ।

চোখ বন্ধ করেই দেওয়ালে মাথা ঠুকতে লাগল আরতি যতক্ষণ ওই রক্তগঙ্গা না হয় তাই.........