মাঝের ঘরের খাটটায় আড় হয়ে গল্প করছিলেন মেজপিসিমা আর ফুলকাকি| পড়ন্ত বিকেলের রোদ ছড়িয়ে ঘরের মেঝেয়, অতিথিরা প্রায় সবাই চলে গেছে, বাড়িটা জুড়ে শুধু শুকিয়ে-আসা রজনীগন্ধা আর লুচি ভাজার তেলের হালকা গন্ধ|
‘দাদার চলে যাওয়াটা এখনও মানতে পারি না রে’, ভারী-ভারী গলায় বলছিলেন মেজ| ‘বউদি তো তাও ভুগল কত দিন, আর দাদা একেবারে - ‘
‘দিদির মৃত্যুটা মেনে নিতে পারেন নি একদম, নইলে কি আর দু মাসের মাথায় ..’ ফুল যোগ করেন|
‘দাদার যে আবার এত টান সে কি আর বোঝা গেছিল? সারাজীবন বউটাকে তো একটা মিষ্টি কথাও বলতে শুনলাম না| ’ মেজর গলা ধারালো হয়ে ওঠে|
‘সত্যি, উনি এলে দিদি একেবারে তটস্থ হয়ে থাকতেন| পান থেকে চুন খসলে সে কি হম্বিতম্বি, বাপরে!’ ফুল জুড়ে দেন|
‘নিজের দাদার নামে বাজে কথা বলতে নেই তাই, কিন্তু রুণুর মতন বউ না হলে এত কেউ সহ্য করত না| প্যাখ্নার কি শেষ ছিল? যেখানেই থাকো খাওয়ার সময়ে সামনে বসতে হবে| খাওয়ার আবার বাহার কত! প্রথমে খানিক ভাত ডাল-তরকারি দিয়ে , তারপরে মাছ দাও, চাটনি দাও, দই দাও , সব আবার একবারে সাজিয়ে দিলে হবে না, পর পর দিয়ে যেতে হবে| এক পদ কম থাকলেও ঝামেলা| আমি তো এসে দেখেছি, বিল্টু যখন পেটে, তখনও বউ ঘেমেনেয়ে সারা সকাল ধরে রান্না করছে| ‘
‘রাতের দুধেও রুটি আগে থেকে ভেজানো থাকলে তুলকালাম করতেন| একবার বোধ হয় বাটি ছুঁড়েও ফেলেছিলেন| আশ্চর্য দিদির ধৈর্য, আবার সাধ্যসাধনা করে খাওয়ালেন|’
‘দিদির বাপের বাড়ি যাওয়া তো ঘুচেই গেছিল প্রায়| ’ ছোটমাসি মেঝেতে বসে সুপুরি কাটছিলেন| ‘গেলেও এক দিনের বেশি থাকতে পেত না| জামাইবাবু নাকি পছন্দ করতেন না|’ মাসি ফুলকাকির সঙ্গে একসাথে স্কুলে পড়তেন|
‘শেষদিকে মা-ও পারতেন না আর | বড্ড খিটখিটে হয়ে গিয়েছিলেন, একে ওই অসুখ তার ওপর - আর বাবার তো আমার কাজও পছন্দ হত না, তাই মাকেই সব….. ঝগড়া লেগে যেত যখন তখন’, বউদি চায়ের ট্রে হাতে পর্দা সরিয়ে ঢুকল|
বাইরে দাঁড়িয়ে শুনতে শুনতে ইন্দিরার ঠোঁটে একটা মুচকি হাসি খেলে যায়| গতকালই মায়ের ট্রাংক খালি করতে গিয়ে একটা পুরনো টিনের বাক্সে লাল শালু জড়ানো হলদে হয়ে যাওয়া একগোছা চিঠি পেয়েছে সে| ‘আমার রুণু সোনামণি... তোমাকে ছেড়ে এসে খুব মন খারাপ, কেবল তোমার কথাই মনে পড়ে ‘..... বাবাকে চাকরির সূত্রে প্রায়ই বাইরে যেতে হত|
No comments:
Post a Comment