Monday, August 13, 2018

বিবাহের বিজ্ঞাপন

দিবা ১১ ঘটিকা| মাতাশ্রী সদ্য বাজার হইতে মত্স্য ক্রয়পূর্বক প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন ও প্রত্যাগমনমাত্রেই রন্ধন্গৃহে প্রবেশ করিয়া সদ্যক্রীত মত্স্য রন্ধনে প্রবৃত্ত হইয়াছেন (সহজপাচ্য মত্স্যের ঝোল রন্ধনে তাঁহার দক্ষতা সুবিদিত) | তপ্ত কটাহে তৈল চড়বড় করিয়া ফুটিতেছে, মত্স্যগুলি সর্বাঙ্গে হরিদ্রাপ্রলেপ ধারণ করিয়া ভর্জিত হইবার অপেক্ষা করিতেছে| বাহিরে অর্চিস্মান রুদ্ররূপ ধারণ করিয়াছেন, অভ্যন্তরে গরমে ও ক্লেশে মাতাঠাকুরানীর মস্তিষ্ক স্ফুটনাংক অভিমুখে  ধাবিত হইয়াছে| আমি গৃহপালিত মার্জারের ন্যায় তাঁহার পিছু পিছু ঘুরিয়া চা, বিস্কুট প্রভৃতি চিত্তদ্রবকারী বস্তুসমূহ সরবরাহ করিয়া সেই হুতাশনবহ্নিতে শান্তিবারি সিঞ্চন করিবার বৃথা প্রচেষ্টায় ফিরিতেছি| পিতা দূরদর্শনে গোপাল ভাঁড় দেখিয়া চিত্তবিনোদনের প্রয়াস করিতেছেন|

উত্তপ্ত তৈলে মত্স্যরাজি পতিত হইবামাত্র বুঝিবা মাতাশ্রীর ধৈর্যের বাঁধ টুটিল| হস্তধৃত খুন্তি শক্ত করিয়া চাপিয়া তিনি পিতাশ্রীর সমীপে আসিয়া দর্শন দিলেন|
‘বাবির আমি যখন বিয়ে দেব, তখন ছেলেটাকে জিগ্যেস করব, বাপধন, তুমি বাজার করতে জান’ ত?  নইলে তোমার হাতে মেয়ে দেব না|’ পদদাপে গৃহ কম্পিত করিয়া তিনি রন্ধনশালে ফিরিয়া গেলেন|


উদগত হাস্য বহু কষ্টে দমন করিয়াছিলাম সত্য, কিন্তু ভাবিয়া দেখিলাম এই প্রথমবার কি প্রকার পাত্র বিবাহ করা উচিত সে বিষয়ে গর্ভধারিণীর সহিত আমার সম্পূর্ণ মতৈক্য ঘটিয়াছে| কিঞ্চিত বিবেচনা করিয়া আমি ইহার সহিত আরেকটি প্রয়োজনীয় গুণ সংযোজন করিয়াছি| ‘বাপু, তুমি রান্না জান’ ত? পলান্ন, কুক্কুটমাংস প্রভৃতির প্রয়োজন হইবে না, প্রত্যহ জীবনধারণের উপযোগী অন্ন প্রস্তুত করিতে জানিলেই চলিবে| নহিলে স্রেফ উপবাসে প্রাণত্যাগ করিতে হইবে - আমি রন্ধনে যেরূপ পারদর্শী, তাহাতে প্রত্যহ আস্কে পিঠা , চাস্কে পিঠা ভিন্ন গতি থাকিবে না|’

বঙ্গদেশে বা তত্সংলগ্ন স্থানগুলিতে এরূপ সহৃদয় সক্ষম যুবাপুরুষ আছেন বলিয়া আমার বিশ্বাস হয় না|

শুক-সারী


মাঝের ঘরের খাটটায় আড় হয়ে গল্প করছিলেন মেজপিসিমা আর ফুলকাকি| পড়ন্ত বিকেলের রোদ ছড়িয়ে ঘরের মেঝেয়, অতিথিরা প্রায় সবাই চলে গেছে, বাড়িটা জুড়ে শুধু শুকিয়ে-আসা রজনীগন্ধা আর লুচি ভাজার তেলের হালকা গন্ধ|

‘দাদার চলে যাওয়াটা এখনও মানতে পারি না রে’, ভারী-ভারী গলায় বলছিলেন মেজ| ‘বউদি তো তাও ভুগল কত দিন, আর দাদা একেবারে - ‘

‘দিদির মৃত্যুটা মেনে নিতে পারেন নি একদম, নইলে কি আর দু মাসের মাথায় ..’ ফুল যোগ করেন|

‘দাদার যে আবার এত টান সে কি আর বোঝা গেছিল? সারাজীবন বউটাকে তো একটা মিষ্টি কথাও বলতে শুনলাম না| ’ মেজর গলা ধারালো হয়ে ওঠে|

‘সত্যি, উনি এলে দিদি একেবারে তটস্থ হয়ে থাকতেন| পান থেকে চুন খসলে সে কি হম্বিতম্বি, বাপরে!’ ফুল জুড়ে দেন|

‘নিজের দাদার নামে বাজে কথা বলতে নেই তাই, কিন্তু রুণুর মতন বউ না হলে এত কেউ সহ্য করত না| প্যাখ্নার কি শেষ ছিল? যেখানেই থাকো খাওয়ার সময়ে সামনে বসতে হবে| খাওয়ার আবার বাহার কত! প্রথমে খানিক ভাত ডাল-তরকারি দিয়ে , তারপরে মাছ দাও, চাটনি দাও, দই দাও , সব আবার একবারে সাজিয়ে দিলে হবে না, পর পর দিয়ে যেতে হবে| এক পদ কম থাকলেও ঝামেলা| আমি তো এসে দেখেছি, বিল্টু যখন পেটে, তখনও বউ ঘেমেনেয়ে সারা সকাল ধরে রান্না করছে| ‘

‘রাতের দুধেও রুটি আগে থেকে ভেজানো থাকলে তুলকালাম করতেন| একবার বোধ হয় বাটি ছুঁড়েও ফেলেছিলেন| আশ্চর্য দিদির ধৈর্য, আবার সাধ্যসাধনা করে খাওয়ালেন|’

‘দিদির বাপের বাড়ি যাওয়া তো ঘুচেই গেছিল প্রায়| ’ ছোটমাসি মেঝেতে বসে সুপুরি কাটছিলেন| ‘গেলেও এক দিনের বেশি থাকতে পেত না| জামাইবাবু নাকি পছন্দ করতেন না|’ মাসি ফুলকাকির সঙ্গে একসাথে স্কুলে পড়তেন|

‘শেষদিকে মা-ও পারতেন না আর | বড্ড খিটখিটে হয়ে গিয়েছিলেন, একে ওই অসুখ তার ওপর - আর বাবার তো আমার কাজও পছন্দ হত না, তাই মাকেই সব….. ঝগড়া লেগে যেত যখন তখন’, বউদি চায়ের ট্রে হাতে পর্দা সরিয়ে ঢুকল|



বাইরে দাঁড়িয়ে শুনতে শুনতে ইন্দিরার ঠোঁটে একটা মুচকি হাসি খেলে যায়| গতকালই মায়ের ট্রাংক খালি করতে গিয়ে একটা পুরনো টিনের বাক্সে লাল শালু জড়ানো হলদে হয়ে যাওয়া একগোছা চিঠি পেয়েছে সে| ‘আমার রুণু সোনামণি... তোমাকে ছেড়ে এসে খুব মন খারাপ, কেবল তোমার কথাই মনে পড়ে ‘..... বাবাকে চাকরির সূত্রে প্রায়ই বাইরে যেতে হত|

|| প্রাক্তন ||



ভোর ভোর পোস্টম্যান কড়া নেড়ে চিঠি ফেলে গেছে
তখনো বিছানা ছেয়ে আধো আধো স্বপনের ঘ্রাণ
তখনো শিশিরগন্ধে ভিজে আছে একলা আকাশ
তখনো মায়াবী আলো তখনো তো অপূর্ব কুয়াশা
তখনো বিশুদ্ধ বায়ু তখনো নিশ্চিন্ত জেগে ওঠা
পোস্টম্যান এসেছিল পায়ে হেঁটে খাকি কোট পরে
দোর ঠেলে বলে গেল - ‘ চিঠি আছে, দরকারি চিঠি’ -

বাক্য তার ভেসে গেল রেডিয়োর গানের মতন
গল্পদাদু কৃষিকথা মহালয়া মহিলামহল
সাদাকালো টিভি আর রোব্বারে উত্তমের বই
পাগল জিলিপি খেত ঘুরে যেত মুশকিল আসান
ঝুঁটিবাঁধা সরস্বতী লালপাড় হলুদ শাড়িতে
মাঝরাতে বলহরি চিত্রহারে শ্রীদেবীর নাচ
কালো টেলিফোন আর পোস্টকার্ডে প্রণাম জানিবা
রানার গাঁয়ের বধূ মাঝেমধ্যে কিশোরকুমার

এইসব, ওইসব - হাজার আলোকবর্ষ দূরে
বয়েস বেড়েছে এই পৃথিবীর আর আমাদেরও
এখন ছুটন্ত দিন এখন হা-ক্লান্ত দিনগুলি
এখন নিয়নসন্ধ্যা অল্প অল্প পানসে, মলিন
আঁধার নামছে দ্রুত এ বিষণ্ন ডাকবাংলো জুড়ে

এখন তরঙ্গমালা ঈথারে ঈথারে চলাচল
এত কথা তবু এই সুনাপন কিছুতে ঘোচে না
টেবিলঘড়িতে বাজে এইবারে চলো মুসাফির
যা পেয়েছ যা নিয়েছ গোছাও হে, বাঁধো গাঁঠরিয়া
এই ঘর এই দোর রোববার মাংসের কড়াই
মিছে হতে মিছে সব প্রেমপত্র আনন্দবাজার
ঝাঁট দাও সাফ করো আবর্জনা রাস্তায় ফেলো না
চিঠি তো এসেছে অব নাইয়া মোরি পারে লয়ে যাও …..