একটি মেয়ের সম্বন্ধ করে বিয়ে হয় একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে । বিয়ের আগে নাম-কা-ওয়াস্তে একটা নিভৃত আলাপ হয়েছিল হবু বরের সঙ্গে, সে দৃশ্যে দেখা গেছে আলমারিতে সাজানো থরে থরে ট্রোফি - মেয়েটি খুব ভালো নাচত। বিয়ের পরে অবশ্য ভোর না হতেই শাশুড়ির সঙ্গে লেগে পড়তে হয় রান্নাঘরে - বর তখন মন শান্ত রাখতে যোগব্যায়াম করে আর শ্বশুর দাঁত মাজেন - ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে শাশুড়িই দিয়ে যান অবশ্য । পুরুষরা খেতে বসেন, টেবিলে ঝোল, চিবোনো ডাঁটা স্তূপ করে রেখেই বেরিয়ে যান যে যার কাজে । দুই নারী সেসব সরিয়ে প্রাতঃরাশে বসে ।
শাশুড়ি মানুষটি খারাপ নন, নতুন বউকে বেশি রাত অবধি আটকান না । এঁটো বাসন মেজে, রান্নাঘর ঝাঁট দিয়ে তিনি যখন শোবার ঘরে যাবার অবকাশ পান, শ্বশুর ততক্ষণে বিছানায় আধশোয়া হয়ে মন দিয়ে হোয়াটস্যাপে ভিডিও দেখছেন ।
ননদের আসন্ন সন্তানসম্ভাবনার কারণে শাশুড়িকে যেতে হলে রান্নাঘরের পুরো দায়িত্ব নতুন বউটির ঘাড়ে এসে পড়ে। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার - বরের আপিসের টিফিন, শ্বশুরের বিকেলের জলখাবার । সে খেয়েছে কিনা, বা কী খেয়েছে - কেউ জানতে চায় না । রান্নাঘরে আধুনিক গ্যাজেট নেই বললেই হয়, ফ্রিজের খাবার খেলে শ্বশুর টেবিল ছেড়ে উঠে যান, নারকোলের চাটনি শিলনোড়ার বদলে মিক্সিতে বাটলে স্বাদের হানিতে হাহুতাশ করেন, উনুনে হাঁড়ির বদলে গ্যাসে প্রেশারকুকারে ভাত রাঁধলে অসন্তুষ্ট হন । বর কিছুতেই রাতে রুটির বদলে ভাত খেতে রাজি হয় না । ফলে মেয়েটির সারাদিনই কেটে যায় কুটতে, ধুতে, রাঁধতে, মাজতে আর মুছতে । রাঁধার পরে খাওয়া, আবার খাওয়ার পরে রাঁধা ।
রান্নাঘরের পাইপ ফেটে গেলে মিস্ত্রি ডাকতে ভুলে যায় বর, অথচ রাতে আলো নিভিয়ে বউকে ডাকতে ভোলে না । যন্ত্রণাদায়ক মিলনের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে মেয়েটির নাকে লেগে থাকে উপচে-ওঠা ডাস্টবিনের গন্ধ , ফোরপ্লের কথা বরকে বললে সে হেসেই উড়িয়ে দেয় - সব জেনে বসে আছে নাকি তার বউ ? আর আলো জ্বেলে যে ফোরপ্লে করবে, কী আছে তার বউয়ের ?
ঋতুসময় এলে মেয়েটি একটু ছুটি পায় - ও সময়ে নাকি রান্নাঘরে যেতে নেই, তাই এক মহিলাকে ডেকে আনা হয় ওই কয়েক দিন ঘরের কাজকর্ম করতে । মেয়েটিকে অবশ্য ওই কদিন কোণের একটা ঘরে থাকতে হয় - ওই কদিনই একটু নিজের মতো সময় পায় সে । সব মিটে গেলে একদিন খাবার টেবিলে সে কথা তোলে - একটা চাকরি করতে পারে না সে?
কীসের চাকরি? না, ডান্স টিচারের। শ্বশুরের মতে, ওসব তাঁদের পরিবারে ঠিক সুবিধে হবে না । শাশুড়ি পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ছিলেন, তাঁকেই তিনি বাবার কথা শুনে চাকরি করতে যেতে দেন নি, এখন আর - বরও বলে চেপে যেতে, পরে দেখা যাবে ।
মেয়েটি কী করে কে জানে, একদিন তার নামে খাম আসে একটা । শ্বশুরের হাত থেকে নিতে গিয়ে কৈফিয়ত দিতে হয়, ইন্টারভিউ লেটার । শ্বশুর বোঝান, চাকরি করতে যাওয়ার কী দরকার, ঘরে থাকলেই তো মেয়েদের মানায় ভালো? সবাইকে দেখা, সকলের সুখসুবিধে দেখা - এ কি একটা ফেলে দেওয়ার মতো ব্যাপার ? - ইত্যাদি, যা দিয়ে নিশ্চিত করা যায় সেবা, সাহচর্য, শ্রম । রাতে বর শুনে এসে রাগ দেখাল - কী দরকার ছিল আগে বাড়িয়ে এসব করার ?
বর শ্বশুর শবরীমালায় যাবেন, আবশ্যিক ব্রহ্মচর্য নিলেন। মেয়েটি আবার ঋতুমতী, তার ঠাঁই একটা দমচাপা ঘরে । ছেলের মাসি এসে তার শোয়ার ব্যবস্থা করে দেন মাটিতে ও মাদুরে । মেয়েটি মোবাইলে দেখে শবরীমালায় ঢোকার অধিকার চাইছে মেয়েরা, রাতের অন্ধকারে লাঠিসোঁটা নিয়ে একদল পুরুষ ভয় দেখিয়ে যাচ্ছে এক প্রতিবাদীকে, স্কুটি পুড়িয়ে দিচ্ছে সেই মেয়ের । সে ভিডিও শেয়ার করলে বর বলতে আসে, ভিডিওটা মোছো দেওয়াল থেকে । মেয়েটি দরজার আড়াল থেকে জবাব দেয়, না । বর মারমুখী হয়ে তেড়ে আসতে গেলে হেসে মনে করায়, কী করবে তুমি? এই একচল্লিশ দিন আমার কাছে আসা বারণ তোমার, জানো না ?
সাত দিন পর নেয়ে ধুয়ে রান্নাঘরে ঢুকলে হাঁক আসে, এই এত কাপ চা চাই, যেমন অতিথি এলে আসত । কিন্তু এবার আর মেয়েটি চা দেয় না কাউকে । বর আর শ্বশুরকে রান্নাঘরে শিকল দিয়ে রেখে সে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায় । আর ফিরবে না বলে ।
আমাদের এক আত্মীয়া ছিলেন । স্বামীর খাওয়ার সময়ে সামনে বসে থাকাটা তাঁর অবশ্যকর্তব্য ছিল । স্বামীদেবতাটিকে ইনস্টলমেন্টে খেতে দিতে হত কিনা, তাই । মানে প্রথমে একটু ভাত, তেঁতো দিয়ে । তারপর আরেকটু, ডাল-তরকারির সঙ্গে । আবার আরেকটু, মাছ বা মাংসের সঙ্গে । তারপর পাতে চাটনি পড়ত । শেষে টক দই । প্রচণ্ড অসুস্থ অবস্থাতেও এভাবে পরিবেশন করে গিয়েছিলেন তিনি । স্বামীটির মনে হয়নি এবার অভ্যেসটা পাল্টানো দরকার ।
তখন ইশকুলের মাঝামাঝি ক্লাসে পড়ি, কী প্রসঙ্গে শিক্ষক অদ্রীশ বিশ্বাস ক্লাসে আলোচনা করছিলেন, অমুক কাজটা কে করে তোমাদের বাড়িতে, বাবা না মা ? তমুকটা? বাথরুম কে পরিষ্কার করে ? খেতে দেয় কে? শেষে এও বলেছিলেন, এসব নিয়ে বাড়ি ফিরে একটু কথা বলে দেখো তো । পরদিন একটি মেয়ে বলল, মা বলেছেন, এ আবার বলার কী আছে, মা ভালোবাসেন, তাই খেতে দেন । অদ্রীশস্যার বললেন, আচ্ছা, মা যদি বলেন, আমি সন্তানকে ভীষণ ভালোবেসে তাকে একটি স্নেহচুম্বন দেব, কিন্তু তাকে খেতে দিতে আমার অনিচ্ছা, তাহলে ?
পরিবারের প্রয়োজনে, সন্তানের প্রয়োজনে ছুটি স্ত্রী বা মা-ই আগে নেন ।
পরিবারের/ সন্তানের প্রয়োজনে কর্মরতা স্ত্রী বা মা-ই আগে চাকরি ছাড়েন ।
কর্মক্ষেত্র থেকে সমান ক্লান্ত হয়ে ফিরে গৃহকর্মে ঢোকেন স্ত্রীই । অতিথি এলে খাবারদাবারের দায়িত্বও স্ত্রীরই ।
বিয়ের পরে মেয়েটিরই দায় ও দায়িত্ব নতুন পরিবারে গিয়ে মানিয়ে নেওয়া ।
(এই প্রত্যেকটি অবস্থারই এক্সেপশন কিছু বিরল ক্ষেত্রে অবশ্যই আছে । এবং পরিস্থিতি খুব ধীরে হলেও পাল্টাচ্ছে, এই আশার কথা ।)
উপরের সব কটা পরিস্থতি এক-একরকমের সাধারণীকরণ । এত স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, জেনেরালাইজেশন বলে এগুলোকে আর চেনাও যায় না । অথবা বড়োজোর ‘ওসব আমাদের ফ্যামিলিতে হয় না ‘ বলে কার্পেটের তলায় ঠুসে দেওয়া হয় ।
দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কিচেন এই ছবিটাই দেখায় । দেখানোর ভঙ্গীটা নিস্পৃহ, নির্মোহ, অভিনয় সংলাপ সবটাই নিচু তারে বাঁধা , অতএব অভিঘাতটা জোরদার ।
অসামান্য অভিনয় করেছেন নিমিশা সাজায়ান। তাঁর অ-নায়িকাসুলভ চেহারা, অপরিষ্কার তেলতেলে মুখ - সব ঢেকে যায় পর্দা জুড়ে তাঁর অনায়াস বিচরণে । চরিত্রের ক্লান্তি, হতাশা, ক্ষোভ - একটি ফ্রেমেও অতি-অভিনয় না করে নিমিশা দেখিয়েছেন তা । বাকিরাও যথাযথ ।
এ ছবি সেসব পুরুষদের দেখা উচিত, যাঁরা জীবনে জলটুকু গড়িয়ে খেতে শেখেননি বা রান্নাঘরে ঢোকেননি । এ ছবি সেসব মহিলাদেরও দেখা উচিত, যাঁরা স্নেহে বা ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে জলটুকু গড়িয়ে খেতে শেখাননি বা রান্নাঘরে ঢুকতে দেননি । আমাজন প্রাইম, ৯.৫/১০। দেখুন দেখুন দেখুন ।
