Monday, June 15, 2020

|| খেলা যখন ||

বিনোদমামু আমার বাবা নয়৷ বাবাকে আমার মনে পড়ে না৷ বাবা দেওয়ালে টাঙানো ছবি । রঙীন বা সাদাকালো । শোবার ঘর, বসার ঘর, সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে টাঙানো থাকে৷ মানে, থাকত ৷ বিনোদমামু আসার পর থেকে অনেকগুলোই সরে গেছে৷ সরিয়ে ফেলা হয়েছে৷

বিনোদ চ্যাটার্জি কবে প্রথম আমাদের বাড়িতে এসেছিল খেয়াল নেই । আমাদের বাড়ি মানে, দাদুর বাড়ি । বাবা মারা যাওয়ার পর মা আমাকে নিয়ে এখানেই ফিরে এসেছিল। আমার আবছা মনে পড়ে, মা তখন সারাদিন কাঁদত। চুল আঁচড়াত না, জামাকাপড় পালটাত না, ভালো করে খেত না। এমনকি আমাকেও কাছে ডাকত না । আমাকে আগলে রাখত মানদাদিদি। দাদু অস্থির হয়ে মায়ের ঘরের বাইরের বারান্দায় পায়চারি করতেন। মাঝরাতেও বারান্দা থেকে তাঁর চটির আওয়াজ পেতাম। 

একটু একটু মনে আছে, তখন লোয়ার নার্সারিতে পড়ি, তখন মাঝেমধ্যেই স্কুল থেকে ফিরে দেখতাম বসার ঘরের সোফায় একটা রোগামতো লোক বসে৷ উসকোখুসকো চুল, গায়ে একটা দোমড়ানো পাঞ্জাবি৷ বেশি কথা বলত না, সামনে চায়ের কাপ নিয়ে বসে থাকত ঘন্টার পর ঘন্টা৷ মা উলটোদিকের কাঠের চেয়ারে, মাঝেমধ্যে কথা বলত দুটো একটা৷ 

তারপর কবে থেকে যেন মা একটু একটু করে উঠে বসল, খাবার টেবিলে এসে বসল সকালবিকেল, সাদা জামাকাপড়ের ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে পরতে লাগল হালকা নীল গোলাপি বেগুনি। আমাকে খাইয়ে দিত মাঝে মাঝে, চুল আঁচড়ে ক্লিপ লাগিয়ে দিত, হোমওয়ার্ক করার সময়ে এসে বসল পাশে।  আমি একটু একটু করে টের পাচ্ছিলাম, মা একটু বেশি বেশি হাসছে, রাতে বালিশে মুখ গুঁজে অত কাঁদছে না যখনতখন৷ আমি ওদের কথার মধ্যে গিয়ে হুটোপুটি জুড়তাম, মা কোলে বসিয়ে গালে গাল রাখত৷ লোকটা কোলে নিত না বটে, তবে কাছে গেলে মাথায় বিলি কেটে দিত মাঝেমধ্যে৷ মা—ই ডাকতে শিখিয়েছিল, বিনোদমামু৷ কিন্তু আমি ওকে ওই নামে ডাকতাম না ৷

দাদু মা-কে সঙ্গে করে তাঁর আপিসে নিয়ে যেতে লাগলেন, আর আমি দেখতে পেলাম আস্তে আস্তে কেমন পাল্টে যাচ্ছে মা। কেমন চকচকে, ধারালো হয়ে উঠছে, শক্ত করে পা ফেলছে মেঝেয়, গলা চড়িয়ে বকছে মানদাদিদিকে, কড়া নজর রাখছে আমার পড়াশোনায়। তারপর দাদু মারা গেলেন আর মা আরও বেশি বেশি সময় দাদুর আপিসে কাটাতে শুরু করল। 

একদিন বিকেলে মহুয়ামাসি এল৷ মায়ের ইশকুলের বন্ধু মহুয়ামাসি৷ আমি ইশকুল থেকে ফিরে টেবিলে বসে চাউমিন খাচ্ছিলাম, মা আর মহুয়ামাসি কথা বলছিল ঘরের অন্য প্রান্তে সোফায় বসে৷ মা মাঝে মাঝে চোখ মুছছিল আর মায়ের পিঠে হাত বোলাচ্ছিল মহুয়ামাসি৷ 
এইটেই সবচেয়ে ভালো হবে বিনি, তুই মন ঠিক কর৷ আমি শুনতে পেলাম৷ আমার মায়ের নাম বিনীতা৷
এর সপ্তাহখানেকের মধ্যে মায়ের সঙ্গে ওই লোকটার বিয়ে হয়ে যায়৷ একদিন সন্ধেবেলা মা আমাকে ভালো ফ্রক পরিয়ে দিল একটা, নিজে একটা জরিপাড় হলুদ শাড়ি পরল৷ অনেকদিন পর ভালো করে চুল আঁচড়ে খোঁপা বাঁধল, কাজল পরল, টিপও৷ ঠোঁটে লিপগ্লস লাগাল অল্প৷ তারপর আমার হাত ধরে নেমে এল নীচে৷ 
বসার ঘরে তখন আট—দশ জন লোক৷ মহুয়ামাসি আর মেসো তো আছেই, আছেন ফোলিও ব্যাগ হাতে এক ভদ্রলোক, আরও কারা কারা যেন৷ সোফার এককোণে জড়োসড়ো হয়ে, মুখে একটা ভ্যাবলাটে হাসি ঝুলিয়ে বসে আছে লোকটা, যাকে মা বিনোদমামু ডাকতে শিখিয়েছে৷ মানদাদিদি সকলকে চা দিচ্ছে৷ মহুয়ামাসি মায়ের খোঁপায় একটা জুঁইয়ের মালা জড়িয়ে দিল৷ 
সেদিন সন্ধেতেই মা আর ওই লোকটার সই করে বিয়ে হয়ে গেল৷ আর বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে আমাদের বাড়িতেই থাকতে এল বিনোদমামু৷ আমি ওকে কোনোদিন বাবা বলে ডাকিনি ৷

বিনোদ চ্যাটার্জি ছবি আঁকত। কোনো একটা কলেজে আঁকা শেখাতও। ওর জিনিসপত্রের মধ্যে তাই অল্প কয়েকটা জামাকাপড় ছিল, আর বেশিটাই ছবি আঁকার সরঞ্জাম। ইজেল, তুলি, নানারকম রং। সেসব নিয়ে লোকটা আমাদের পাশের ঘরে এসে ঢুকল। 
আমি তখনও মায়ের ঘরেই শুই, মায়ের দাদুর আমলের বড় খাটে, মায়ের পাশে। রাতে মায়ের হাত আমাকে ছুঁয়ে  থাকে, আমি মায়ের নিঃশ্বাসের শব্দ পাই। ওই লোকটা পাশের ঘরে আসার পর থেকে টের পেতাম, মায়ের নিঃশ্বাস কেমন অস্থির অস্থির, হাত একবার বিছানায় নামে, একবার বালিশে। মা রাতে না ঘুমিয়ে ছটফট করে ।

আমি বড় হচ্ছিলাম। মা যতই আমাকে আগলে রাখুক, স্কুলে বন্ধুরা আমাকে রেহাই দিত না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করত নতুন বাবা আমাদের বাড়িতেই থাকে কিনা। 
- বাবা না, বিনোদমামু হয়। আমি বলেছিলাম। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েছিল অঙ্কিতা, সুদেষ্ণা, সোমাশ্রী। 
- তা বিনোদমামু থাকে কোথায়? তোদের সঙ্গেই নাকি? কপালের চুলগুলো সরাতে সরাতে জিজ্ঞেস করেছিল অঙ্কিতা।
- থাকে তো । মানে আমি মায়ের সঙ্গে থাকি, ও তো পাশের ঘরে ঘুমোয়। 
হি হি হি হি হি - সবকটা মেয়ে এ ওর গায়ে হেসে গড়িয়ে পড়তে থাকে। আমি কিছু বুঝি না। কিন্তু আমার মাথার মধ্যে কিছু একটা বাজতে থাকে। আমি খেয়াল করতে থাকি, মায়ের যেদিন অফিস থেকে ফিরতে দেরি হয়, সেই দিনগুলোতেই বিনোদমামুও সন্ধে পার করে কলেজ থেকে ফেরে। মা গাড়িতে, ওই লোকটা হয়তো বাসে, হয়তো বা ট্যাক্সিতে। সেই দিনগুলোতে মায়ের মুখটা কেমন ঝকঝক করে, আমাকে আদর করে বেশি বেশি, পড়া  নিয়ে খিটখিট করে না একদম।
আর রাতে একদম নিশ্চিন্তে ঘুমোয়। 

আমি বুঝতে পারছিলাম মা একটু একটু করে দূরে সরছে, সবসময় আমাকে নিয়ে পড়ে থাকছে না। শুধু আমাকেই আর ভালোবাসছে না। 
কারণ মা এখন ওই লোকটাকেও ভালোবাসে।
আমি বিনোদমামুকে ঘেন্না করতে শুরু করলাম। 
মা বুঝতে পারল না। মানদাদিদি বোধ হয় বুঝেছিল। স্কুল থেকে ফিরলে আমাকে খেতে দিয়ে নিজের মনে গজগজ করত, এত বড় মেয়েকে ফেলে - এদের কোনো লজ্জা আছে, ছি ছি। আমি চুপ করে শুনতাম। আমার খারাপ লাগত না।

একদিন স্কুল থেকে ফিরলাম প্রচন্ড গা ম্যাজম্যাজ আর পেটব্যথা নিয়ে। শরীরে কী যেন একটা অস্বস্তি। বাথরুমে গিয়ে দেখি, প্যান্টিতে থকথকে বাদামী তরল। কমোড লাল হয়ে গেল রক্তে। 
আমি তখন ভয়ে আধমরা। আমার প্রচন্ড অসুখ করেছে, নিশ্চয়ই। এবার আমি একদম মরে যাব। 
কাঁদতে কাঁদতে বাথরুম থেকে বেরোলাম। মানদাদিদি রান্নাঘরে আছে, কিন্তু আমার মা-কে চাই। 
ফোঁপাতে ফোঁপাতে আমাদের শোবার ঘর পার করে কখন ওই লোকটার ঘরে ঢুকে পড়েছি খেয়াল করিনি। এমন কি, লোকটা যে বাড়িতে আছে তাই জানতাম না। শেষে মাটিতে ছড়ানো একগাদা রং-তুলির উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে খেয়াল হল ।
লোকটা কিন্তু ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল। কী হয়েছে, রিনটিন? কী হল? 
একেবারে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললাম। মা-কে ডাকো । রক্ত। আমি মরে যাব । 
লোকটা একটু থমকে গেলেও সামলে নিল তাড়াতাড়ি। হয়তো কিছু একটা আন্দাজ করেছিলই, আমাকে যত্ন করে চেয়ারে বসাল| নিজে বসল আমার সামনে মাটিতে হাঁটু গেড়ে। 
দ্যাখো রিনটিন, তোমার মা থাকলে সুবিধে হত । এখন আমি তোমায় কী করে কী বলি ! মেয়েদের এরকম হয়, প্রতি মাসেই হয় । ভয় পেয়ো না। এসো আমার সঙ্গে, তোমার মায়ের আলমারিতে দেখি কিছু জিনিসপত্র পাওয়া যায় কিনা ।
আমার পায়ে ছোপ ছোপ লাল-নীল রং। আমার স্কার্টে রক্তের দাগ। আমি বড় হয়ে গেছিলাম । লোকটাকে আমার ততটাও খারাপ লাগছিল না । 

ব্যথা কমলে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘন্টাখানেক পর ঘুমটা খানিক পাতলা হয়ে এল । খুটখুট আওয়াজ । হালকা পারফিউমের গন্ধ । মা ফিরল । হাতের ব্যাগটা রাখল টেবিলে । আলোটা জ্বালতে যাবে, ওপাশের দরজা থেকে একটা হালকা গলাখাঁকারি শোনা গেল। 
-একবার এদিকে শুনে যাও, বিনি। এই প্রথম লোকটাকে মায়ের ডাকনাম ধরে ডাকতে শুনলাম । এর আগে পুরো নামেই ডাকতে শুনেছি, খাবার টেবিলে, বারান্দায়। 
মা পাশের ঘরে গেছে । কথা বলছে ওরা। আমি কান খাড়া করে শুয়ে থাকি । আমার নামটা কয়েকবার বলা হচ্ছে শুনতে পাই । দুটো গলা কাছে এগিয়ে আসে । দরজায় দাঁড়ায় । 
থ্যাঙ্ক ইউ, বিনু। খসখসে গলায় বলছে মা । চোখ বুজেও আমি বুঝতে পারি, মায়ের একটা হাত বিনোদমামুর হাতের মধ্যে । 
লোকটাকে কেমন ঘেন্না হয় আমার । সেদিন রাতে শরীরখারাপের ছুতো দেখিয়ে খেতে উঠি না ।

দিনকয়েক পর দেখি আমাদের সবার ঘরের পাশের ছোট ঘরটা ঝাড়পোঁছ হচ্ছে। এই ঘরটায় দাদু মাঝেমধ্যে অফিসের কাজ সারতেন। একটা টেবিল-চেয়ার ছিল ও ঘরে, ঘরের মাঝখানে একটা আরামকেদারা। 
বিকেলে এসে দেখলাম ও ঘরে একটা খাট ঢোকানো হয়েছে আর আরামকেদারা সরে গেছে দেওয়ালের দিকে । টেবিলে আমার বইপত্র সাজানো, বিছানায় আমার পছন্দের জয়পুরি চাদর । জানালায় বাহারি পর্দা ।
এখন থেকে এটা তোমার ঘর । বড় হচ্ছ, তোমার একটা আলাদা ঘর দরকার এবার । মা বলল অফিস থেকে ফিরে । আজ থেকে এখানেই শুয়ো । আমি তো রইলামই পাশের ঘরে ।
সেদিন রাতে ঘরের দরজা বন্ধ করলাম না অন্ধকারে ভয় লাগে বলে । সারারাত ঘুম এল না ভাল। কে জানে কীসের জন্য কান খাড়া রইল। সারারাত পাশের ঘরে একটানা ফ্যানের আওয়াজ শুনলাম। 


অঙ্কিতা, সুদেষ্ণা, সোমাশ্রীরা এখন আরও বেশি হাসাহাসি করে। কী রে, এতদিনে কিচ্ছু দেখিসনি? সত্যি? আমিও ওদের সঙ্গে হাসাহাসি করি । স্কুলবাসে অঙ্কিতার মোবাইলে লুকিয়ে সবাই মিলে দেখা হয় ভিডিও । অবশ্যই মিউট করে । মা বলেছে আরও দুবছর পরে আমি মোবাইল পাব। বাড়ির ডেস্কটপ থেকে ফেসবুক করি মাঝে মাঝে । মা বলেছে ওটা প্রজেক্টের কাজের জন্য । 

সেদিন বেলা বারোটা নাগাদ হঠাৎ তুমুল বৃষ্টি নেমেছিল । রাস্তায় প্রায় জল জমে যায় দেখে স্কুল ছুটি দিয়ে দেওয়া হল । অনন্য আমাদের বাড়ির কাছাকাছিই থাকে, ওর মা আমাকেও ওদের গাড়িতে তুলে বাড়িতে ছেড়ে দিলেন । 
বাড়িতে ঢোকার মুখে প্রাণভরে ভিজলাম খানিক । তারপর চাবি ঘুরিয়ে ভিতরে ঢুকলাম । মানদাদিদির আজকাল নিচে নামতে অসুবিধে বলে সদর দরজার একটা চাবি আমার কাছেই থাকে আজকাল। জুতোমোজা ভিজে গেছে, সেসব ছেড়ে ভিজে পায়ে ছপছপ করে উঠলাম দোতলায় ।
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে । বারান্দায় টবের গাছগুলো আনন্দে ভিজছে । মানদাদিদি কোথায় কে জানে । বাড়িটা কেমন অস্বাভাবিক নিঝুম, নিঃশব্দ ।

না, নিঃশব্দ নয় । কারণ মায়ের পাশের ঘরটা থেকে কিছু আবছা আওয়াজ আসছে । আওয়াজটা চেনা চেনা কি? কোথায় শুনেছি এ শব্দ? কোথাও শুনেছি কি ?
সব শব্দ ডুবে গেছে । বৃষ্টির শব্দ শুনতে পাচ্ছি না আমি । পায়ে পায়ে হেঁটে যাচ্ছি ওই ঘরের দিকে । ঘরের দরজা বন্ধ । জানালার উপরের পাল্লাটায় সামান্য ফাঁক । সেখান দিয়ে আসছে ওই শব্দটা । 
আমি শব্দটা চিনেছি । ওই শব্দ মিউট করেই আমরা লুকোনো মোবাইলে ভিডিও দেখি । 
আমি থামতে পারছি না। এগিয়ে যাচ্ছি, চোখ রাখছি জানালায় । আর দেখছি সেই দৃশ্য যা আমার কখনও দেখা উচিত ছিল না।
মা বিছানায়, নীচে। উপরে ওই লোকটা । জানালার ফাঁক দিয়ে অল্প আলো পড়েছে ওদের গায়ের চামড়ায় । কারণ চামড়ার ওপর কিছু নেই আর । দুটো শরীর উঠছে নামছে, ঘাম চিকচিক করছে দুজনের মুখে । বিনোদ আর বিনীতা । দুজনের গলা থেকেই চূড়ান্ত সুখের সব শব্দ ছড়িয়ে যাচ্ছে ঘরে । মায়ের মুখে কী এক আনন্দ মাখামাখি হয়ে আছে , সেরকম আমি কোনোদিন দেখিনি। আমি ভালো রেজাল্ট করলে নয়, স্পোর্টসে প্রাইজ পেলে নয়, অফিস থেকে ফিরে আমাকে দেখতে পেলেও নয় । এই মাকে আমি চিনি না । 

কতক্ষণ কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না । হয়তো অজান্তে একটু আওয়াজ করে ফেলেছিলাম । ঝপ করে মুখ তুলল লোকটা । জানালা থেকে পালিয়ে যেতে যেতেও মনে হল, লোকটার চোখদুটো কী সুন্দর ! 
নিজের ঘরে ঢুকে ভিজে জামাকাপড়েই আছড়ে পড়লাম বিছানায় ।  দরজায় ছিটকিনি দিয়ে । অবাধ্য হাত আপনিই নেমে গেল দু পায়ের ফাঁকে । 

বৃষ্টিতে ভেজার জন্যই কি না জানি না, তুমুল জ্বর এসে গেল সন্ধেয় । সারারাত ছটফট করতে করতে টের পেলাম, খাটের পাশে ঠায় বসে আছে মা । 
জ্বরটা পরদিন ছাড়ল না, তার পরের দিনও না । হাতপা-য় ভয়ানক ব্যথা, বিছানা থেকে উঠতে গেলেই মাথা টলে যায়। এই দুদিন মা অফিস গেল না। মাথায় আইসব্যাগ দিল, খাবার এনে দিল ঘরে । দুদিন পরে ঘর ছেড়ে বাইরে এসে দেখলাম, মায়ের পাশের ঘরটা ফাঁকা । জানলাম, বিনোদমামু জিনিসপত্র নিয়ে ছাতের ঘরে উঠে গেছে । 
কেন? আমি জিজ্ঞেস করি । মুখটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে । 
সামনে ওর এক্সিবিশন আছে। একমনে ছবি আঁকবে । তাই।  মায়ের ঠোঁটের কোণদুটো কাঁপছিল ।

এর পর থেকে বিনোদমামু কমই নামত নীচে। ওই খাওয়ার সময়টুকুই যা, তাও মাঝে মাঝে দেখতাম নিজের থালাটা নিয়ে উঠে যাচ্ছে ওপরে । বা হয়তো খেতে আসছেই না । 
মায়ের চুল একটা দুটো করে সাদা হচ্ছিল, মুখের চামড়া কুঁচকে যাচ্ছিল তাড়াতাড়ি । ওই লোকটারও মাথাভর্তি নুন-মরিচ চুল । 
মায়ের সঙ্গে কথা ক্রমশঃ কমে আসছিল আমার । অথচ ওই লোকটা সামনে এলেই মায়ের মুখে আলো জ্বলে উঠত। লোকটার দিকে তাকিয়ে  দেখতাম তখন । লোকটাকে বেশ ভালো দেখতে, এখনও । 

স্কুলের শেষ বছর এটা । বাড়িতে থাকারও হয়তো। কারণ আমি দূরের কলেজে পড়তে যেতে চাই । ইন্টারনেটে দেখছি । মা-কে বলিনি। মা শুধু জানে আমি খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করছি । টিউশন, পরীক্ষা, কেরিয়ার ।  
অঙ্কিতা, সুদেষ্ণা, সোমাশ্রীদের হোয়াটস্যাপ করি মাঝে মাঝে । মা একটা মাঝামাঝি ধরণের মোবাইল দিয়েছে আমায় । ক্যামেরাটা ভালো, কিন্তু বেশিক্ষণ গেম খেলার চেষ্টা করলে স্লো হয়ে যায় । ইউটিউব ভিডিও আটকে যায় মাঝে মাঝে । কলেজে উঠে টিউশনি করে টাকা জমিয়ে আমি একটা ভালো মোবাইল কিনব । 
টুকটাক ফেসবুক করি । মাঝেমধ্যে মেসেঞ্জার টিং করে ওঠে । হাই। তোমার বন্ধু হতে চাই । কী সুন্দর দেখতে তোমায় । পাত্তা দিই না । ব্লক করি যেভাবে বইয়ের ফাঁকে পাওয়া চিঠি কুচিকুচি করি একাগ্র নিষ্ঠুরতায় । এদের আমি চাই না । আমি কী চাই, আমি তা জানি । 

আজ দোল। এমনিতে আমাদের বাড়িতে দোল খেলার চল নেই । বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দোল খেলি, মা খুব একটা পছন্দও করে না। ভূত সাজতে আমারও যে ভাল লাগে এমন নয় । ওই নিয়মরক্ষা ছোট্ট এক প্যাকেট আবির আসে, মা দুটো টিপ দেয় আমার গালে আর কপালে । মায়ের গায়ে কোথাও আবির দেওয়া মা পছন্দ করে না । ওই গুঁড়ো রং তুলে ফেলে বারান্দায় বসে দেখি, রাস্তায় হুল্লোড় লাগিয়েছে পাড়ার বাচ্চাগুলো । লালনীল বাঁদুরে রঙে সব মুখগুলো কালো, জামা সপসপে ভিজে । আনন্দের চিলচিৎকারে কানে তালা ধরে যায় । অবশেষে সাড়ে বারোটা একটা নাগাদ মায়েরা এসে সবকটার নড়া ধরে বাড়ি নিয়ে যান । আমরা তখন খেতে বসি। মানদাদিদি সেদিন স্পেশাল পোলাও আর চিকেন রান্না করে ।  

এবারের দোল অবশ্য আলাদা । সন্ধে নাগাদ বসন্ত উৎসবের প্ল্যান হয়েছে ছোট্টমত। মানে ওই হলুদ শাড়িটাড়ি, মাথায় ফুল, নানারকম গয়না । নীচের বড়ঘরে খানিক আবির, গানবাজনা। বন্ধুদেরই প্ল্যান এসব, আমি হলে ঝুটঝামেলায় যেতাম না । 
স্কুলের শেষ বছর বলেই মা হয়তো কিছু বলেনি।  শাড়ি বের করে দিয়েছে, একটা ইমিটেশন মুক্তোর সেটও । কাজল লিপস্টিক মায়ের ড্রেসিংটেবিলে থাকে, আমি জানি । 

দুপুর নাগাদ মা একটু অফিসে বেরোল । কী ফাইল নাকি ফেলে এসেছে , কয়েক ঘণ্টাতেই চলে আসবে ।  
আমি আর মানদাদিদি বাইরের ঘরটা একটু ঝাড়াঝুড়ি করলাম। সোফাগুলো ঠেলে দিলাম পিছনে, সেন্টার টেবিলটা সরালাম, খুঁজেপেতে গোটা দুই শতরঞ্চি এনে পেতে দিলাম মেঝেয় । এই সব করে দেখি চারটে বেজেছে । 
বন্ধুরা ছটা নাগাদ আসবে বলেছে ।  মানদাদিদি চা এনে দিল, চা খেয়ে সাজুগুজু করতে যাব। 
সোফায় বসে কাপটা সবে ঠোঁটে তুলেছি, কে যেন ঘরে ঢুকল । মানদাদিদির দিকে তাকিয়ে বলল, ইয়ে, একটু পুরোনো ন্যাকড়া যদি - 
আমার দিকে নজর পড়তে একটু হাসির মতো করে বলল, ওঃ, তুমি । কেমন আছো, রিনটিন ? 
আমার চুল মাথার ওপর একটা ঝুঁটি করে বাঁধা, মুখে হালকা ধুলো । লোকটার পাঞ্জাবিতে ইতিউতি রঙের ছোপ, গালেও একটু রং লেগেছে । মনে পড়ল, আজ দোল । 
আমার সর্বনাশ হয়ে গেল। 

শাড়ি আমি নিজেই পরতে পারি, কুঁচিটা ধরে দিল মানদাদিদি । আঁচলে সেফটিপিন লাগালাম, মায়ের রেখে যাওয়া গয়নাগাটি পরে নিলাম যন্ত্রের মতো। কাজল লাগালাম ঘন করে। খয়েরি লিপস্টিক। চুলটা আঁচড়িয়ে খুলে রাখলাম ।
এ বছরের আবিরের প্যাকেটটা কোথায় রাখা আছে আমি জানি ।  সামান্যই ব্যবহার হয়েছে । গাঢ় লাল রঙের গুঁড়ো হাতে নিয়ে আমি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম । 
বাইরের আলো তখন মরে আসছে । আমি গিয়ে দরজায় দাঁড়ালাম । ইজেলে একটা ছবি । ঘরের কোণে কতগুলো গোটানো ক্যানভাস । ঘরের মেঝেয় ছবি আঁকার সরঞ্জাম । লোকটা ইজেলের সামনে একটা টুলে বসা । পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকাল । 
রং দিতে এলাম, বললাম আমি ।  


লোকটা নড়ল না । শাড়ির খসখস শব্দ তুলে হেঁটে গিয়ে আমি ওর সামনে হাঁটু মুড়ে বসলাম মেঝেয় । কিছু বোঝার আগেই এক খাবলা লাল রং মাখিয়ে দিলাম গালে । 
আমাকে রং দাও । প্লিজ । ওর হাঁটুর উপর দু'হাত রেখেছি আমি । ওর নুন-মরিচ চুল, ওর ঝকঝকে চোখ এখন আমার খুব কাছে । খুব । বিপদঘন্টি টের পাচ্ছি আমি। ঢং, ঢং, ঢং ...

নীচে যাও, রিনটিন । গম্ভীর গলায় আদেশ এল । পাগলামো কোরো না । যা-ও । 
আমি আর পারলাম না । কাঁদতে কাঁদতে মুখ ঘষছি ওর কোলে। ধুয়ে যাচ্ছে কাজল, লিপস্টিক লেগে যাচ্ছে পাঞ্জাবিতে । আমাকে ফিরিয়ো না । একবার , একবার ....
কথা শোনো রিনটিন, নীচে যাও । এরকম করতে নেই, লক্ষ্মী তো । লোকটা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে । সে হাতে স্নেহ ছাড়া কিচ্ছু নেই, টের পাই । কেন নেই? 
ফলে আমি আরও কাঁদতে থাকি । খিমচে ধরি পাঞ্জাবির কোণা । আমার চুল এলোমেলো হয়ে যায় । একবার, একবার .......
হাতদুটো এবার জোর করেই আমাকে সোজা করে দেয় । রিনটিন , তুমি কী বলছ তুমি জানো? 
জানি, জানি, জানি । সেই বৃষ্টির দুপুর থেকেই ...
রিনটিন, আমি তোমার বাবা হই !
কিন্তু আমি তোমার মেয়ে নই, বলে দু'হাত বাড়িয়ে সেই নুন-মরিচ চুল আঁকড়ে ধরি আমি। ঠোঁট চেপে ধরি ঠোঁটে । বাকি সবটুকু আবির ছড়িয়ে যায় আমার শাড়িতে ।

পরক্ষণেই একটা প্রচণ্ড ধাক্কা আমাকে ছিটকে ফেলে দেয় । একটা ছোট টেবিলে কপালটা ঠুকে যায়, কীসে যেন খোঁচা লাগে ব্লাউজের হাতায় । ফ্যাঁস করে ছিঁড়ে যায় সেটা । 
কোনোরকমে উঠে দাঁড়াতেই একটা চড় এসে পড়ে গালে । সঙ্গে একটা কঠিন ঠাণ্ডা স্বর । 
বেরিয়ে যাও, রিনটিন । আর কোনোদিন এখানে এসো না । 

মানদাদিদি হয়তো আওয়াজটাওয়াজ শুনেই সিঁড়ির মুখে এসে থাকবে ।  আমাকে আলুথালুভাবে নামতে দেখে চিৎকার করে উঠল । বন্ধুরা কয়েকজনও এসে গিয়েছিল ততক্ষণে । 
সিঁড়ির নিচের ধাপে বসে পড়লাম আমি । আমার চুল এলোমেলো, কাজল লেপ্টে গেছে, শাড়িময় আবির। ব্লাউজের এক কোণ ছেঁড়া । সুদেষ্ণা আমাকে জড়িয়ে ধরল । ধীমান আর অভিজ্ঞান দৌড়োল ওপরে ।
মাথাটা বোঁ করে ঘুরে উঠল । তারপর আর কিছু মনে নেই । 

চোখ খুলে দেখি নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে আছি । টেবিলল্যাম্পটা জ্বলছে । আমার গায়ে বাড়িতে পরার জামা, শাড়িটা চেয়ারে জড়ো করা। চুলগুলো খানিক ভিজে। কেউ জল ঢেলেছিল ?
দোতলায় কোথাও কোনো শব্দ নেই । মায়ের ঘরে আলো নেভানো । বারান্দায় একটা বাল্ব জ্বলছে টিমটিম করে । 
একতলায় যাওয়ার সিঁড়ির দিকে এগোই । অনেক মানুষের চাপা স্বর শোনা যাচ্ছে । এত লোক কোথা থেকে এল? 
বসার ঘরে অনেক লোক । সুদেষ্ণা, অঙ্কিতা, অভিজ্ঞান । সুদেষ্ণার মা এসেছেন । ধীমানের বাবাও । আরও কিছু লোক এদিক ওদিক ছড়িয়ে। এদের অনেককে আমি চিনি না । একটা সোফার ওপর দুমড়েমুচড়ে বসে আছে মা । চুল উস্কোখুস্কো, মুখচোখ ফোলা । মা কি কান্নাকাটি করেছে ? মায়ের পাশে মহুয়ামাসি । 
ওদিকের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে আছে মানদাদিদি । আর তার থেকে একটু দূরে, মেঝেয় শোয়ানো একটা বস্তু। চাদরঢাকা । চাদরের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে পাঞ্জাবির কোণা । 
ও পাঞ্জাবি আমি চিনি । আজ বিকেলে ওই পাঞ্জাবি আঁকড়েই আমি - 
এসব কী হল ? কী করে হল? 

আবার বোধ হয় মাথাটা ঘুরে গেছিল । সুদেষ্ণার মা ধরে ফেললেন । 
কী কপাল বল তো । তোর - মানে বিনোদ যে এরকম করে বসবে কে জানত ! ছাদের ঘরে হঠাৎ ফ্যান থেকে -
তিনি আমাকে একটা চেয়ারে বসান । হাতে ধরিয়ে দেন জলের গেলাস । ভয়ে আমার বুকের ভিতরটা হিম হয়ে যায় । আমি হেঁচকি তুলে কাঁদতে থাকি । ঘরের সবাই আমার দিকে মুখ তুলে তাকায় । সুদেষ্ণার মা আমার পিঠে হাত বুলোচ্ছেন ।  'পুলিশ' শব্দটা শুনতে পাই কয়েকবার । 
আমি চোখ তুলি। একজোড়া চোখের সঙ্গে চোখাচোখি হয় । কেঁদে কেঁদে লাল হয়ে যাওয়া দুটো চোখ । সে চাউনিতে স্নেহ নেই, ভালোবাসাও নয় । সে চোখে শুধু ঘেন্না। রাগ। অপমান। প্রতিশোধ ।

ও মা নয়। বিনীতা নয় । ও আমার  বাবার স্ত্রী ।  ও সব জানে । সব বুঝেছে । ও আমাকে ছাড়বে না ।