||১||
‘মেয়েরা দু’জাতের| একদল মাতৃতান্ত্রিক বাই নেচার,
.... বাকিরা পিতৃতান্ত্রিক, অবলা|.. প্রথম জাতের মেয়েতে জগত পরিপূর্ণ
থাকলে‘উইমেন্স লিব মুভমেন্ট’-এর প্রয়োজন হত না|... শুধুপুরুষজাতি কেন তাবত মনুষ্যসমাজ
তথা সসাগরা বসুন্ধরা তাঁদের অবিসংবাদিত প্র্ভুত্ব মেনে নেয়| এঁরা এঁদের জীবনের সব
কিছুকেই অনায়াস স্বায়ত্ব-শাসনে রাখেন| ... বধূবেশে সাজায়ে কিঙ্কিনী বাসরঘরে প্রবেশ
করলেও মুকুট মাথায় রাজদণ্ড হাতে…. সেখান থেকে আবির্ভূত হন..|সুলতানা রিজিয়া, কি
ঝাঁসীর লক্ষ্মীবাঈ, রানী রাসমণি, কি রানী ভবানী, বা আমার গর্ভধারিণী, এঁরা সব এই
জাতের| আমাদের চেয়ে একেবারে অন্য মেটিরিযালে তৈরি|’
মাতৃয়ার্কি, নবনীতা দেবসেন
বেশ কিছুকাল আগে বাবাকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম|মা-কে
নিয়েও লিখব, সেটাই স্বাভাবিক ছিল| মুশকিল হল, সন্তানের, বিশেষ করে মেয়ের পক্ষে, মা-কে
নিয়ে লেখা, সে তিনি পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের, যে কোনো বয়সের, যে কোনো সামাজিক
অবস্থানের মা-ই হোন না কেন, খুব, খু-উ-ব কঠিন|যিনি অতদিন ধরে নিজের শরীর,
স্বাস্থ্য, চেহারা, খাদ্যে রুচি বরবাদ করে সন্তানকেধারণ করে রাখেন,
কল্পনা-করতেও-কষ্ট-হয় এমন যন্ত্রণা সহ্য করে তাকে নিরাপদে পৃথিবীর আলোহাওয়ায় পৌঁছে
দেন, এক তো তাঁর সম্পর্কে লেখার চেষ্টা করাটাই ধ্যাষ্টামো, তার ওপর মায়েরা এমন করে
আমাদের বড় হয়ে ওঠা, পছন্দঅপছন্দ, যুক্তিবিশ্বাস, জীবনযাপনে জড়িয়ে থাকেন যে তাঁদের
নিয়ে আলাদা করে ভাবনাচিন্তা করার কথাটা আমরা ভেবে উঠতে পারি না| বাবা খানিকটা দূরের
মানুষ, তাই তাঁকে নিয়ে ফুলিয়েফাঁপিয়ে লেখা চলে, কিন্তু মা সকালে বিছানার পাশে রাখা
চায়ের কাপের মতই স্বতঃসিদ্ধ, তাই তাঁকে নজরে পড়ে না| বাতাসে নিশ্বাস নিই, কিন্তু
তার অভাবে দমবন্ধ হয়ে মারা যেতে পারি সেই চিন্তাটা যেমন মাথায় আসে না, তেমনি মা
সর্বদা কাছে-দূরে থেকে যেভাবে জীবনটা গুছিয়ে দেন সেটা আমরা টের পাই না, বা যখন পাই তখন
অনেক দেরী হয়ে গেছে|
আমার মা প্রথমে বাসন্তীদেবী কলেজ, পরে কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপিকা, ডাকসাইটে ছাত্রী (গোটাচারেক সোনার মেডেল
লকারেআছে, দেখেছি), ছাত্রছাত্রীদের কাছে প্রায় ভগবানের সমান(যে সব ছাত্রছাত্রী
মায়ের হাত ধরে বৈতরণী পার হয়েছে, সত্যি বলছি, আমার পাল্লায় পড়লে তাদের অনেকেই একশোয়
গোল্লা পেত, নয়তো তাদের ডিগ্রীটিগ্রি কিস্যু হত না), সহকর্মীদের কাছে স্নেহপরায়ণা
দিদির মতো| এই অবধি সবাই জানে, নতুন করে বলার কিছু নেই| আমি একটু বেশি দেখেছি
কিনা,তাই একটু বেশি জানি| আমি জানি মায়ের ভেতরটা ইস্পাতের মতন শক্ত| নিজে যেটা ঠিক
বলে জানেন, সেটা থেকে মা-কে কেউ নড়াতে পারবে না,সে বিশ্বাসটা ঠিক-ভুল যাই হোক না
কেন| মা যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতের বিভাগীয় প্রধান, ছাত্র ইউনিয়নের
পান্ডারা ঝাণ্ডা উঁচিয়ে হাজির হয়েছিল হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্টের ঘরে, পরীক্ষা
পিছনোর দাবী জানিয়ে| একথা-সেকথার পর তাদের বক্তব্য ছিল, তাদের দাবী না মানলে
আন্দোলন হবে, কেউ ঠেকাতে পারবে না| অন্য কেউ হলে হয়তো কিছুটা কথা-কাটাকাটি হত, তারপর
ঘেরাও পুলিশ প্রভৃতি হওয়াও আশ্চর্য ছিল না, কিন্তু মা সেদিক দিয়েও গেলেন না| তাঁর
বক্তব্য ছিল, যেহেতু শিক্ষক এবং ছাত্রদের সম্পর্ক কারখানার শ্রমিক-মালিকের
সম্পর্কের মত নয়, তাই সেখানে ‘আন্দোলন’-এর প্রসঙ্গই উঠতে পারে না| ব্যাস, পান্ডারা
গলে জল, সব সমস্যার সমাধান|
এই অবধি পড়ে যদি কারুর মনে হয় আমার মা ভয়ঙ্কর কড়া
ধাতের লোক, তাহলে হয় নি, হয় নি, ফেল| মা আর দশটা চাকরি-করতে-বেরনো মেয়ের মতই,
সংসার-সন্তান নিয়ে সর্বদা চিন্তিত, কতক্ষণে-বাড়ি-ঢুকব সেই চিন্তায় সব সময় কাতর,
চাকরি করতে গিয়ে পরিবারকে যথেষ্ট সময় দিতে পারছেন না, এই অপরাধবোধে কাবু|আমি তখন স্কুলে
পড়ি, একদিন মায়ের সকালে ক্লাস ছিল, রান্না করে যেতে পারেননি| দুপুর রোদে দেড়
ঘন্টার জন্যে বাড়ি ফিরেছিলেন আমার অধ্যাপিকা মা, শুধু তাঁর মেয়েকে গরম ভাত
খাওয়াবেন বলে(মা যা করেছিলেন সেটা আমি জন্ম জন্ম মনে রাখব, কিন্তু
ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, ছেলেমেয়ের জন্যে সবতাতে বাড়াবাড়ি না করাই ভালো| বাবামা
তাঁদের ক্ষমতার শেষ সীমায় গিয়ে ছেলেমেয়ের সুখশান্তি নিশ্চিত করবেন, এটা বাবামা-ছেলেমেয়ে
কারুর পক্ষেই স্বাস্থ্যকর অভ্যেস নয়)|
আর সত্যি কথা বলতে কি, মা যা পারেন, পেরেছেন, তার
সিকিভাগ করতে পারলেও আমি ধন্য হয়ে যেতাম| মা তাঁর এই বয়েসেও রাত তিনটে অবধি খাতা
দেখে পরদিন সকাল দশটায় ক্লাস নিতে যেতে পারেন, বিকেলে ফিরে কাজকম্ম, দোকানপাট স-ব
করতে পারেন| আমিআমার এই বয়েসেই একদিন রাত জাগলে পরদিন দুপুরে ভোস ভোস করে
নাকডাকাই, সারা সকাল কাপের পর কাপ চা ছাড়া মাথা তুলতে পারি না|
নারীবাদ মানে পুরুষের বিরোধিতা করা নয়, ঝাণ্ডা
উঁচিয়ে সমান অধিকারের কথা বলা নয়, বরং পুরুষের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে তাদের কাজগুলো
সমান ভালো বা বেশি ভালোভাবে করে দেখানো | ক্রমাগত নিজের বুদ্ধিতে, মেধায়, যোগ্যতায়
শান দেওয়া, যাতে সমাজ, সংসার, প্রকৃতির সব মার জয় করে সক্কলের চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া
যায়, সব্বাইকে ছাপিয়ে ওঠা যায়|ছেলেদের কাজ আর মেয়েদের কাজ বলে যে আলাদা করে কিছু
হয় না, সেটা মা তাঁর জীবনে পদে পদে প্রমাণ করে দিয়েছেন| বাড়িতে কাজ হচ্ছে, কাঠ
কিনতে হবে? কাঠের দোকানে হাজির হবেন মা| অসময়ে কলে জল ফুরিয়ে গেছে? কুচ পরোয়া নেই,
মা ফোনটোন করে ঠিক জলের গাড়ি হাজির করে ফেলবেন| এমন কোনো আত্মীয় মারা গেছেন যাঁর
দেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার লোক নেই? মা লোকজন নিয়ে সে কাজ উদ্ধার করে দেবেন| একবার নয়,
বার বার| একবার জনৈক কাবাডিওয়ালা আমাদের বাড়ি থেকে একখানা তালা চুরি করে ভেগেছিল|
গোদরেজের তালা, তার দাম নেহাত কম নয়, চুরি গেলে অনেক টাকার লোকসান| অন্যলোকে
হাহুতাশ করে কাটিয়ে দিত, কিন্তু মা সেই পদার্থই নন| ড্রাইভার ও গাড়ি নিয়ে তাকে ধাওয়া
করে ধরে তালা তো উদ্ধার করলেনই, তাকে রাস্তায় কান ধরে ওঠবসও করালেন| আমার মা গাড়ি
সারাতে নিয়ে যান, বাড়ি রং হলে সেটার তদারক করেন, দিদার দেখভাল করেন, আমাদের ঊনকোটি চৌষট্টি প্রয়োজনের খবর রাখেন, লোকলৌকিকতা সারেন,
বাজার, দোকান স-অ-ব করেন| আর আমরা ঝাড়া-হাত-পা হয়ে নিজেদের বিরাট কাজের লোক প্রমাণ
করতে করতে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াই|
(এই অবধি পড়ে যে প্রশ্নটা সবার মনে বিজবিজ করছে,
‘মানে, ইয়ে, বাবা কি করেন?’ তার উত্তরে বলছি,‘কচি সংসদ’ মনে আছে? পিতৃনিন্দা
মহাপাপ, কিন্তু টুনি-দিদির স্বামীর বর্ণনাটা আর একবার পড়ে নিন, জবাব পাবেন )
মাকে নিয়ে লিখতে বসার মুশকিল হল, কি লিখব আর কি
ফেলব সেটা গুছিয়ে ওঠা যায় না| কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব? ক্লাস এইটের এনুয়াল পরীক্ষার
সাত দিন আগে থেকে আমি প্রবল মাইগ্রেনে কাবু, চোখ মেলে বইয়ের দিকে তাকালেই মাথা
ছিঁড়ে পড়ছে|ওই সাত দিন মা আমার পাশে বসে রইলেন আমার বইপত্র নিয়ে, নিজের কাজ ডকে
তুলে আমাকে পড়ে পড়ে শোনালেন পরীক্ষার পড়া|
বুড়োবয়সে, বিটেক থার্ড ইয়ারে, মাথায় বাই চাপল,
ল্যাব রিপোর্ট কম্পিউটারে লিখব| দিব্য দেখতে হবে, সকলে ধন্যধন্য করবে| লিখতে গিয়ে
যখন টের পেলাম যে কম্পিউটারে লিখতে প্রচুর সময়ও লাগবে, তখন ফেরার পথ বন্ধ| হাতে
লিখতে হলে পরেরদিন সকালে রিপোর্ট জমা হওয়ার কোনো আশা নেই (তখনো সারারাত জেগে কাজ
নামানোর অভ্যেসটা হয়নি ;))| রিপোর্ট মনের মতো করে শেষ করতে করতে রাত নটা বাজল|
কপালের ঘামটাম মুছে প্রিন্টআউট নেব বলে প্রিন্টার অন করেছি, ঘড়ঘড় শব্দে প্রতিবাদ
জানিয়ে সে কাজে সাময়িক ইস্তফা দিল|আমার তখন মাথায় হাত, পারলে পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসে
যাই| গেল, সব গেল, আমার রিপোর্ট, ভালো গ্রেড পাওয়ার আশা, সব ওই প্রিন্টারের কালির
মতন ধূসর হতেহতে মিলিয়ে গেল| নিশ্চয়ই এক্কেবারে
জঘন্য রেজাল্ট হবে এইবার (সেটা এমনিতেও হয়েছিল, বি-টেকের রেজাল্ট লজ্জায় কাউকে
দেখাতে পারি না ;)) | মা আশেপাশেই ছিলেন, কিছুক্ষণ সামনে এসে দাঁড়িয়ে থেকে, আমার
অবস্থাটা বুঝে, একটুও না ঘাবড়ে, আমাকে টেনে তুললেন, আমাকে ও বাবাকে বগলদাবা করে
বেরিয়ে পাড়ার একটিমাত্র সাইবার কাফে থেকে বেশ কিছু টাকা গচ্চা দিয়ে আমার
প্রিন্টআউটের ব্যবস্থা করলেন|রিপোর্ট ফাইলস্থ করে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন দশটা বেজে
গেছে|
জুনিয়র স্কুলে ছুটির কাজ হিসেবে ছোটছোট রচনা
লিখতে দিত| সঙ্গে ডবল যন্ত্রণা, একটা করে ছবিও আঁকতে হত| এটাই নাকি বালকবালিকাদের
যেকোনো বিষয় শেখানোর বেস্ট পদ্ধতি| একবার লিখতে দেওয়া হল ‘চড়াই’ বিষয়ে|কেঁদেককিয়ে
লেখা যদিবা হল, আমার হাত দিয়ে ছবি বেরোনোর আশা দূর অস্ত| যে প্রজাপতি আঁকলে
শুয়োপোকা মনে হয়, সে আঁকবে চড়াই? আমি শুরুতেই হাত তুলে দিলাম| তখন মুশকিল আসানের
ভূমিকায়, আবার এবং আবার, মা| বইটই দেখে, কালো-বাদামী পেন্সিল দিয়ে মা যে চড়াইটা
আমার খাতায় এঁকেছিলেন, তার চেয়ে বোধহয় সত্যিকারের চড়াইকেও ভালো দেখতে হয় না|
চড়াইসমেত সেই খাতাটা লফট-এ তোলা আছে, এ জীবনে ওটা আমি কাউকে দিচ্ছি না|
||৩||
সকলেই জানেন, মায়েদের কয়েকটা চেনা প্যাটার্ন
থাকে|মায়েরা দারুণ ভালো গোয়েন্দা হন(‘ওখান থেকে ফিরতে এত সময় লাগল?’/ ‘সঙ্গে কে
ছিল?’)মাঝেমধ্যে ম্যাজিকও দেখান(আমার বইমেলা থেকে কেনা বই ঠিক এনুয়াল পরীক্ষার আগে
হাওয়া হয়ে যেত| পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরদিন দেখতাম সেগুলো তাকের ওপর দিব্যি গ্যাট হয়ে
বসে আছে) নামজাদা হোটেলের যে-কোনো শেফকে লজ্জা দিতে পারেন (মন খারাপ/ মেজাজ বিগড়েছে?
সেরা দাওয়াই মায়ের হাতের যে-কোনো-একটা-কিছু| রান্নাঘরে কিছু থাক না থাক, প্লেট
দেখে সেটা বোঝা যাবে না) আর চমত্কার ডাক্তার হন (আমার ক্ষেত্রে পরীক্ষিত সত্য|
পায়ে ১/১০ ইঞ্চি কেটেছে/হাতে নুনছাল উঠে গেছে/ টেবিলের কোনায় ঠোক্কর খেয়েছি, মায়ের
কাছে ঠোঁট উল্টে হাজির হলাম| প্রেসক্রিপশন? ‘আহা, ষাট, ষাট!’) আমার মায়েরও আছে| সে
কথা বলার জন্যে এই লেখা নয়| মায়ের কতগুলো বিশেষত্ব আছে| খনার বচন, কবীরের দোহা,
ঠাকুরমশায়ের ক্ষণিকা যেমন, মায়েরও তেমনি কিছু অবিস্মরণীয় বক্তব্য রয়েছে| যেগুলো
একজায়গায় করলে অনায়াসে একখণ্ড কথামৃত (কথাঞ্জলি নয়, মাইন্ড ইউ)হয়ে যেতে পারে|
উদাহরণ চাই?
১| ব্লকের পুজো শেষ, ঠাকুর লরি চেপে বিসর্জনে
যাবে| আলো-ধূপধুনো-ঢাক সহযোগে লরি ব্লক প্রদক্ষিণ করবে, তারপর বড়রাস্তা ধরে রওনা
হবে|(এই রেওয়াজটা এখনো রয়েছে| তবে তখন হাতে-গোনা কয়েকজন লরিতে চড়ত, এখন বাচ্চাকাচ্চা-টিনএজাররা
ব্লক ঘুরে বেদম নাচের পর দলে-দলে টেম্পোয় ওঠে| ওদের কি হিংসে যে হয় আমার!)
বয়েস তখন দশের কমই হবে, মামার হাত ধরে লরির পিছন
পিছন চললাম| আমার অনন্ত আগ্রহে এবং ঘ্যানঘ্যানে আবদারে আমার ভালোমানুষ মামাকে ততক্ষণ
অবধি বাইরে থাকতে হল, যতক্ষণ লরিটা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে না যায়| দু-চারবার বাড়ি ফেরার
কথা মনে করাননি তা নয়, কিন্তু এ দুনিয়ায় কেই বা কবে ভালো পরামর্শ শুনেছে?
বাড়ি ঢুকেই একেবারে বাঘের মুখে| প্রথমে খানিক
ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকা| (তাতেই আমার পেটের ভাত দই হয়ে যায়, জানা কথা) তারপর
মামার মিনমিনে শান্তিরক্ষার প্রচেষ্টাকে নস্যাত করে প্রশ্ন, ‘তুমি কি লরির পিছন
পিছন কৈলাস অবধি যাবে ভেবেছিলে?’ তার পর অন্তত বছর তিনেক বিসর্জনে ঠাকুরের পিছন
পিছন বেরোলেই একটা সাবধানবাণী উড়ে আসত – নট আপটু কৈলাস, কেমন?’ (কয়েক বছর হল
বিসর্জনে বেরোলে আর এমন হুমকি শুনতে হয় না| তাহলে কি আমায় মা একটু কম ভালবাসছেন,
আজকাল? ;) )
২| সামনের বাড়ির বাচ্চাটির হাতেখড়ি| ছোট্ট অনুষ্ঠান, আমি সসম্মানে নিমন্ত্রিত| সে কালো শ্লেটের উপরখড়ি দিয়ে অ আ লিখছে, আমি পাশে মেনিবেড়ালের মতন পুঁটুলি পাকিয়ে বসে হা করে দেখছি, অনুষ্ঠান শেষ হলে লুচিটুচির সম্ভাবনা রয়েছে| আমার যে আধ ঘন্টার মধ্যে বাড়ি ফেরার কথা, উত্তেজনায় এক্কেবারে ভুলে মেরে দিয়েছি| বাড়ির কাজের মেয়েটি আমাকে ডাকতে আসতে হুঁশ ফিরল| লুচির আশা ত্যাগ করে ল্যাজ গুটিয়ে ফিরে এলাম| মুখোমুখি হতেই প্রশ্ন, ‘ তুমি কি অমুকের ছেলে বি-এ পাশ করলে ফিরবে ভেবেছিলে?’
৩| মানুষের দুটো কান মাথার দুপাশে কেন থাকে,
জানেন? আমার মা জানেন| ‘যাতে কোনো কথা পছন্দ না হলেই ওপাশের কান দিয়ে সোজা বের করে
দেওয়া যায়|’ যাতে সেসব ‘বাজে কথা’ ব্রেনে গিয়ে জটলা না পাকায়| ‘মাথায় জায়গা ঐটুকু,
তাতে বাজে কথা ভরলে আর ভালো জিনিস থাকবে কোথায়’? তাই গারবেজ ইন, গারবেজ আউট| সিম্পল|
৪| রেডিওতে গান হচ্ছে, আশা ভোঁসলে দরদ দিয়ে
গাইছেন ‘আসব আরেকদিন, আজ যাই?’ মা রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া অন্য কোনো গান শোনেন না,
শুনতে চান না (আমারও এই রোগ ছিল, খড়গপুরে পড়তে এসে সেরেছে| এখন হানি সিং, রিচার্ড
ক্লেডারম্যান, পেন মসালা স-অ-ব শুনি| প্রথম পছন্দ যদিও সুচিত্রা মিত্রের গলায়
রবিঠাকুরের গান| এখনও) অতএব ফোঁস করে উঠলেন , ‘ আজ কেন, এক্ষুণি যা!’
৫| আমি ডিম খেতে মারাত্মক রকম ভালোবাসি| আমাকে একমাস
মাছ না দিন, আপত্তি করব না, পনেরোদিন চিকেন বন্ধ রাখুন, দিব্যি চালিয়ে দেব, কিন্তু
পরপর দুদিন আমাকে ডিম খেতে না দিন, আপনার সঙ্গে আমার পাকাপাকি বন্ধুবিচ্ছেদ হয়ে
যাবে| মারপিট, দাঙ্গাহাঙ্গামা, ফৌজদারী হয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়| দিনে একটা (কখনো
একাধিক) ডিম আমার চাই-ই চাই| সেদ্ধ, পোচ, অমলেট যে কোনো অবস্থায়, সকাল/দুপুর/বিকেল/রাত্রি
যে কোনো সময়ে – আমি ডরাই না কভু ডিমের কোলেস্টরলে| এহেন আমাকে ছোটবেলায় মাছ
খাওয়াতে প্রবল বেগ পেতে হত (এখনও হয়)| আজ খেয়ে নাও আর কোনদিন দেব না, ভুল করে কিনে
ফেলেছি খেয়ে নাও সোনা, আর এসবে কাজ না হলে স্রেফ সনাতন পদ্ধতি, মানে কানে আড়াই
প্যাঁচ| তারপরে হাউমাউখাউ, শেষে চোখ মুছতেমুছতে মাছের গুষ্টির তুষ্টি করতে কোনোমতে
গলাধঃকরণ|(আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, বাচ্চাদের মাছ খাওয়ানোর সময়ে কাঁটা ছাড়ানোর
নাম করে মাছটাকে যে চটকে পিণ্ডি পাকানো হয়, তাতেই খাবার ইচ্ছে অর্ধেক হয়ে যায়, আর
স্বাদেরও বারোটা বাজে|)এরকমই এক দিনে, আমি মাছের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছি,
বেয়াড়া ঘোড়ার মতন ঘাড় বেঁকিয়ে রয়েছি – আমি খাব না খাব না খাব না রে| মা অনেক
চেষ্টা করেছেন, কিন্তু আমি প্রতিজ্ঞায় অটল – এগ এবার, মাছ নেভার| (হু হু বাবা,
বললে হবে? আমার ডিমপ্রীতির পিছনে মায়ের ভূমিকাই কম নাকি? স্কুল ছুটির পরে মায়ের কলেজের
লাইব্রেরীতে বসে হটকেসে রাখা ভাত-মাখন-ডিমসেদ্ধর স্বাদ ভুলতে পারলাম না বলেই তো আমার
এই অবস্থা|) মা ঘর্মাক্ত ক্লান্ত তিতিবিরক্ত হযে শেষে বলেই ফেললেন, ‘ছোটবেলা থেকে
ডিম খেয়ে খেয়ে পেটে তো পোলট্রি হয়ে গেল, তাও ডিম খেতে এত ভাল লাগে কি করে?’
৬| মা বহুবছর পড়িয়েছেন (‘ছাত্রছাত্রী চরিয়ে বুড়ো
হয়ে গেলাম’), গলায় ভোকাল কর্ডের ঘষাঘষিতে সিঙ্গার্স নডিউল হল| ডাক্তার বললেন
অপারেশন করতে হবে| আমরা ভয়ে মরি, মা গটগটিয়ে নার্সিংহোমে গিয়ে শুয়ে পড়লেন (তার আগে
ছলছল চোখে একটা উইলও করেছিলেন বোধ হয় ;)), ঘন্টাখানেকের মধ্যে মিটে গেল, পরের দিন
ছুটি| নডিউল-এর বায়োপসি হল, সব রিপোর্ট ঠিকঠাক| গোল বাধল অন্য জায়গায়| ডাক্তার
নিদান দিলেন, এক মাস কথা বন্ধ, গলার পুরোপুরি বিশ্রাম|(সে নিয়ম অবশ্য পরের দিনই
একবার ভেঙেছিল| আগেরদিন সন্ধ্যেয় পুজোর বাজার করতে বেরিয়ে কিঞ্চিত অতিভোজন হয়েছিল,
ফলে রাতে সামান্য পৈটিক গোলযোগ হয়| পরদিন সকালে চোখ খুলে দেখি মা মশারির সামনে
দাঁড়িয়ে – ‘তুমি ভালো, বাবা? সব ঠিক আছে?’)তখন পুজোর ছুটি, মায়ের কলেজ বন্ধ ঠিকই, কিন্তু
আমরা রয়েছি যে? চিড়িয়াখানার জানোয়ারদের মা সামলাবেন কিভাবে, হ্যাট হ্যাট না বলতে
পারলে?
আগেই বলেছি, মায়ের ডিকশনারিতে ‘অসম্ভব’ বলে কোনো
শব্দ নেই| মা একটা রুলটানা ছোট ডায়েরি যোগাড় করলেন, ওতেই সব ইন্সট্রাকশন লেখা হতে
লাগল| বেশিরভাগই এক লাইনের এবং আমাকে উদ্দেশ্য করে লেখা– ‘দিদুনকে বলে এস আমি একটু
চা-পাউরুটি খাব’ গোছের| এক সন্ধ্যেয় আমাকে পড়াতে বসেছেন, আমি সামান্য বাঁদরামো
করছি| ভাবখানা, বকতে তো পারবেন না, তাহলে আর ভয় কি? চড়টড়গুলো দৌড়ে পালিয়ে ম্যানেজ
করে নিতে পারব| ও হরি, এ কি ? খাতায় লেখা হল – ‘আমার শরীর ভাল না| বেদম মার খাবে|’
সে খাতাটা আমি এখনও খুঁজছি, পেলে বাঁধিয়ে রাখব|
৭| জীবনে কোনকালে কসরত করার অভ্যেস ছিল না|
বেশিরভাগ বাঙালি ‘ভালো’ ছেলেমেয়ের মতন বরাবর বিশ্বাস করে এসেছি, সকালে উঠে পড়তে বসতে
হয়, খেলাধুলো ছোটাছুটি শুধু সময় নষ্ট, ওসব তারাই করে যাদের মাথায় গোবর পোরা| ফলে
ছোট থেকেই আমি কিঞ্চিত গাবলু, লালমোহনবাবুর মত শরীরের সব মাসল ব্রেনে জমা পড়েছে
(পড়েছিল কিনা এখন সন্দেহ হয়)| সেসব নিয়ে কোনদিন মাথাও ঘামাইনি, ঢলঢলে জামাকাপড় পরে
সুখেই ছিলাম| হঠাত মাস্টার্স করার সময়ে নিজে নিজে স্কিনি জিন্স কিনতে গিয়ে গোল
বাধল| অন্ততঃ চারটে দোকান ঘুরলাম, কোথাও আমার মাপের জিন্স ঠিকঠাক পাওয়া গেল না (তখনও
মোটা, থুড়ি, কার্ভিদের জন্য কেতাদুরস্ত জামাকাপড় পাওয়া যেত না)| ব্যাপারটা খুব আতে
লাগল, তড়িঘড়ি জিমে ভর্তি হলাম| প্রথমদিন হাত-পা নাড়িয়ে জ্বর এসে গেল (যাঁরা নতুন
জিমে ভর্তি হন, তাঁদের সবারই এটা হতে পারে| ঘাবড়ে যাবেন না, কসরত চালিয়ে যান)|
কদিন পর থেকে দেখলাম, বাঃ, বেড়ে লাগছে তো ! ঘাম ঝরছে, খিদে বাড়ছে, জামাকাপড় ঢলঢল
করছে (প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, শেষ অবধি ওই চারটে দোকানের একটা থেকেই স্কিনি জিন্স
কিনেছিলাম| সে জিন্স আমি এই সেদিনও পরেছি)| হস্টেল থেকে বাড়ি গিয়েও হাঁটাহাঁটি
শুরু করলাম|
মা প্রথমটা কিছু বলেননি| ভেবেছিলেন এ ভূত আমার
মাথা থেকে আপনি নামবে| যখন বুঝলেন ব্যাপারটা সেরকম হচ্ছে না, তখন নিজেই ফিল্ডে
নামলেন| আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে এক্সারসাইজ করলে এনার্জি কমে যায়, শরীর
খারাপ হয়ে যায়, ইত্যাদি ইত্যাদি| কিন্তু আমি নাছোড়| বহুদিন পরে নানারকম জামাকাপড়
পরতে পারছি তখন, আমি সেসব শুনব কেন? আমি উল্টে ওয়ার্কআউট করার প্রয়োজনীয়্তা
সম্পর্কে লেকচার শুনিয়ে দিলাম| হার্ট ভালো থাকে, ফিলগুড হরমোন শরীরে দাপাদাপি করে,
ঘুম ভালো হয়, আয়ু বাড়ে, টা টা, আমি চললাম মর্নিং ওয়াকে|
এসবে কাজ হল না দেখে মা অন্য রাস্তা ধরলেন| এক্সারসাইজ
করলে নাকি বুদ্ধি কমে যায়| দেখো নি, পালোয়ানরা কসরত করে, তারা মাথার কাজ করে কখনো
শুনেছ? বেশি এক্সারসাইজ করলে তুমিও ওরকম মাথামোটা হয়ে যাবে|
আমিও তক্কো জুড়ি, ‘তবে বিবেকানন্দ যে এক্সারসাইজ
করতেন?’ কিছুদিন আগেই সিমলের বাড়িতে তাঁর ডাম্বেল চেস্ট এক্সপ্যান্ডার বক্সিং
গ্লাভস দেখে এসেছি, অতএব স্মৃতিটা টাটকা| (সত্যি বলতে কি, নিয়মিত ব্যায়াম করার
অভ্যেস না থাকলে আমেরিকার শীতে না খেয়ে থেকে ভদ্রলোক অনেক আগেই পটল তুলতেন,
আমেরিকাবাসী ভাই ও বোনেদের সঙ্গে সম্পর্ক পাতানো আর হয়ে উঠত না| রামকৃষ্ণ মিশন
বলেও কিছু থাকত কি ?) মায়ের সপাট জবাব, ‘ওই এক্সারসাইজ করতে করতেই তো অত অল্প বয়সে
মরে গেল’ !
বন্দে মাতরম|